ক্ষমতার অহংকার ইতিহাসের কাছে কখনো জয়ী হয়নি
গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি বন্দুক নয়; জনগণের বিশ্বাস। রাষ্ট্রের প্রকৃত মর্যাদা ক্ষমতার প্রদর্শনে নয়; নাগরিকের অধিকার রক্ষায়। অথচ যখন ছাত্র-যুবসমাজ নিজেদের ন্যায্য দাবি নিয়ে রাজপথে নামতে বাধ্য হয়, আর সেই দাবির জবাবে যদি সংলাপের পরিবর্তে বলপ্রয়োগ, ভয় প্রদর্শন কিংবা দমননীতি বেছে নেওয়া হয়, তখন প্রশ্ন জাগে — আমরা কি সত্যিই গণতন্ত্রের চেতনাকে ধারণ করছি?
আজকের ছাত্র কেবল একজন শিক্ষার্থী নয়; সে আগামী দিনের বিজ্ঞানী, শিক্ষক, চিকিৎসক, বিচারক, প্রশাসক এবং রাষ্ট্রনায়ক। তার হাতে থাকার কথা বই, খাতা, কলম ও স্বপ্ন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই হাতেই আজ প্রতিবাদের প্ল্যাকার্ড। এটি কোনো সভ্য রাষ্ট্রের গৌরবের চিত্র নয়; বরং রাষ্ট্রের নীতিগত ব্যর্থতার এক গভীর প্রতিচ্ছবি।ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে শাসনব্যবস্থা মানুষের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করতে চেয়েছে, ইতিহাস একদিন তাকেই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। লাঠির আঘাতে শরীরকে আহত করা যায়, কাঁদানে গ্যাসে জনসমাবেশ ছত্রভঙ্গ করা যায়, কিন্তু সত্যের দাবিকে, বিবেকের প্রতিবাদকে কিংবা একটি প্রজন্মের আত্মমর্যাদাকে কখনো পরাজিত করা যায় না। প্রশ্ন করা রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়; বরং সুস্থ গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি। যে সমাজে প্রশ্ন করার অধিকার সংকুচিত হয়, সেখানে স্বাধীনতার পরিধিও ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে আসে। তাই আজকের প্রশ্নগুলো কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়; অন্যায়, বৈষম্য, দুর্নীতি ও জবাবদিহির অভাবের বিরুদ্ধে।
আমরা জানতে চাই — কেন সংলাপের পথ এড়িয়ে যাওয়া হল? কেন মানুষের দাবিকে গুরুত্ব দেওয়ার আগে শক্তি প্রদর্শনের প্রয়োজন দেখা দিল? কেন নাগরিকের কণ্ঠকে সম্মান করার পরিবর্তে তাকে নীরব করার চেষ্টা করা হল? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জনগণের প্রাপ্য।আরও বেদনাদায়ক বিষয় হল, সমাজের একাংশ, এমনকি কিছু অভিভাবকও, এই আন্দোলনের প্রতি উদাসীন কিংবা বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করছেন। তাঁদের কাছে বিনীত প্রশ্ন, যে সন্তানের জন্য দিন-রাত পরিশ্রম করেন, সেই সন্তানের ভবিষ্যৎ যদি অনিয়ম, দুর্নীতি, বৈষম্য কিংবা অন্যায্য ব্যবস্থার কারণে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তবে নীরবতা কি কোনো সমাধান?
যে সংগ্রাম আজ রাজপথে চলছে, তা কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের একচেটিয়া লড়াই নয়। এটি ন্যায়ের পক্ষে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে; দুর্নীতির বিরুদ্ধে, স্বচ্ছতার পক্ষে; বঞ্চনার বিরুদ্ধে, অধিকারের পক্ষে। এই লড়াই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মর্যাদা ও সম্ভাবনাকে রক্ষার লড়াই। ক্ষমতার চেয়ারে বসে থাকা সকলের প্রতি একটি বিনীত কিন্তু দৃঢ় আহ্বান, ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখুন। অহংকারের প্রাসাদ বারবার নির্মিত হয়েছে, কিন্তু মানুষের ন্যায্য আকাঙ্ক্ষার সামনে তা বারবার তাসের ঘরের মতো ধসে পড়েছে। ক্ষমতা কখনো চিরস্থায়ী নয়; কিন্তু ক্ষমতার ব্যবহারের ইতিহাস চিরকাল মানুষের স্মৃতিতে থেকে যায়।
আমরা সংঘাত চাই না। আমরা প্রতিশোধ চাই না। আমরা অরাজকতা চাই না। আমরা চাই ন্যায়বিচার, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের সম্মান। আমাদের প্রতিবাদ হবে দৃঢ়, কিন্তু শান্তিপূর্ণ। আমাদের কণ্ঠ হবে উচ্চ, কিন্তু মানবিক। আমাদের সংগ্রাম হবে ন্যায়, অধিকার, সংবিধানের মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ আগামী নিশ্চিত করার লক্ষ্যে।
শেষে শুধু একটি কথাই ইতিহাসের ভাষায় উচ্চারণ করতে চাই — ক্ষমতার আয়ু সীমিত, কিন্তু মানুষের স্মৃতি দীর্ঘ। চেয়ার একদিন বদলে যায়, কিন্তু ইতিহাস কখনো বদলায় না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চারিত প্রতিটি সত্য একদিন ইতিহাসের দলিলে ন্যায়ের সাক্ষ্য হয়ে অমর হয়ে থাকে।







