রুক্ষ মাটিতে মিয়াওয়াকি বনাঞ্চল, ছায়া ঘেরা স্কুলেই চলছে পাঠ

দৈনিক জনকণ্ঠ, নিজস্ব সংবাদদাতা, জঙ্গিপুর: শান্তিনিকেতনের আদলে মুক্তমনা খোলা আকাশ আর জাপানি প্রযুক্তির যুগলবন্দি। রুক্ষ মাটিতে সবুজায়নের এক অভিনব মহীরূহ তৈরি হচ্ছে মুর্শিদাবাদের ফরাক্কার শ্যামলাপুরে। প্রকৃতির কোলে গড়ে ওঠা অনির্বাণ গাছের স্কুল চত্বরে এবার মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে আধুনিক ‘মিয়াওয়াকি’ বনাঞ্চল। বিশ্ব পরিবেশ দিবসে এক হাজার চারা রোপণের পর, অরণ্য সপ্তাহের বৃহস্পতিবার এই স্কুলের ১০০ জন পড়ুয়া নিজেদের মায়ের নামে রোপণ করল আরও ১০০টি দেশীয় চারাগাছ। মুর্শিদাবাদ জেলা জীববৈচিত্র বিভাগের কো-অর্ডিনেটর অমিত পাণ্ডে বলেন, “মিয়াওয়াকি হলো জাপানি পদ্ধতির এক বিশেষ বনাঞ্চল, যেখানে অত্যন্ত অল্প জায়গার মধ্যে ঘনভাবে গাছ লাগানো সম্ভব। মানুষ পরিবেশ নিয়ে ভাবছে, এটা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।”
শ্যামলাপুরের এই রুক্ষ প্রান্তরে মূলত জারুল, দেবদারু, অর্জুন, হরিতকি, জাম, কুল ও বেলের মতো খাঁটি দেশীয় প্রজাতির গাছের চারা বসানো হয়েছে। পুরো বনের দেখভালের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাই। লক্ষ্য একটাই—খুব দ্রুত যেন এই রুক্ষ জমি সুশীতল অরণ্যে পরিণত হয় এবং সেই ঘন গাছের ছায়ায় বসেই চলতে পারে আগামীর পঠনপাঠন। পাঁচ বছর আগে মাত্র ৫ জন আদিবাসী পড়ুয়াকে নিয়ে পথ চলা শুরু করেছিল ‘অনির্বাণ গাছের ইস্কুল’। বর্তমানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ১৩০। শান্তিনিকেতনের প্রাক্তনী তথা ফরাক্কার সৈয়দ নুরুল হাসান কলেজের বাংলার অধ্যাপক অংশুমান ঠাকুরের মস্তিস্কপ্রসূত এই বিকল্প শিক্ষালয়। কোনও চুন-কাম করা দেওয়াল নেই, নেই কোনও গুমোট ক্লাসরুম। গাছের ছায়ায়, খেজুর পাতার চাটাইয়ে বসেই চলে আদিবাসী পড়ুয়াদের অক্ষরজ্ঞান।
উদ্যোক্তা অংশুমান বাবু বলেন, “গ্রামের আদিবাসী ছেলেদের শিক্ষার মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনাই ছিল আমাদের লক্ষ্য। তাই প্রকৃতির খোলা হাওয়া আর গাছের তলাকেই আমরা বেছে নিয়েছি।” প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৬টা থেকে পৌনে ১০টা পর্যন্ত চলা এই স্কুলে গড় হাজিরা ৮০ শতাংশের বেশি। পড়াশোনার পাশাপাশি সমস্ত পড়ুয়াদের জন্য প্রতিদিন পুষ্টিকর খাবারেরও ব্যবস্থা থাকে। সবুজায়নের এই লড়াই কেবল শ্যামলাপুরেই থমকে নেই। পরিবেশ সচেতনতা বাড়াতে ফরাক্কা বাগ দাবড়া ফরেস্ট ও জঙ্গিপুর বনোদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে এদিন একটি বর্ণাঢ্য র্যালি ও বৃহৎ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিরও আয়োজন করা হয়। রুক্ষ মাটিকে ভালোবেসে, গাছকে পরম বন্ধু করে শ্যামলাপুরের এই গাছের ইস্কুল আজ গোটা জেলার কাছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।









































































































