ভারতের ধ্রুপদী যোদ্ধার বিদায়, শান্ত নায়ক অজিঙ্ক রাহানের অবসর

দৈনিক জনকণ্ঠ, মুহাম্মদ শাহবাজ: মাঠের সবুজ ঘাসে যখন উত্তেজনার পারদ চরমে উঠত, যখন প্রতিপক্ষের সুইং আর বাউন্সের সামনে ধসে পড়ত একের পর এক নামী ব্যাটার তখনই নিঃশব্দে ক্রিজে গিয়ে দাঁড়াতেন এক শান্ত যুবক। বুক চিতিয়ে, মাটি কামড়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলাই ছিল যাঁর স্বভাব। সেই অজিঙ্ক রাহানে ভারতীয় ক্রিকেটের ‘জিদ্দি’ ও ‘খাদুস’ মুম্বই ঐতিহ্যের অন্যতম শেষ প্রতিনিধি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানালেন। ৩৮ বছর বয়সে, ২০ বছরের দীর্ঘ ক্রিকেট পথচলায় টুপি নম্বর ২৭৮-কে চিরতরে তুলে রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। সোশাল মিডিয়ায় এক আবেগী ভিডিও বার্তার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সব ফরম্যাট থেকে নিজের অবসরের কথা ঘোষণা করেন ‘জিনক্স’।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে রাহানের কেরিয়ারকে শুধু পরিসংখ্যানের চশমায় মাপা এক মস্ত বড় ভুল হবে। ৮৫টি টেস্টে ৩৮.৪৬ গড়ে ৫০৭৭ রান (১২টি সেঞ্চুরি), ৯০টি ওয়ানডেতে ২৯৬২ রান (৩টি সেঞ্চুরি) কিংবা ২০টি টি-টোয়েন্টি এই সংখ্যাগুলো একটি চিত্র ফুটিয়ে তোলে ঠিকই, কিন্তু যা প্রকাশ পায় না তা হলো রাহানের অদম্য চরিত্র। থানের ডোমভিলির এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা রাহানের স্বপ্ন ছিল একটাই দেশের হয়ে নীল বা সাদা জার্সি পরা। কোনো সংক্ষিপ্ত পথ বা কোনো বিশেষ সুবিধা ছিল না; ছিল কেবল কঠোর পরিশ্রম আর মুম্বই ময়দানের আত্মত্যাগ। ২০১৪ সালে লর্ডসে জেমস অ্যান্ডারসনদের প্রাণঘাতী বোলিংয়ের মুখে দাঁড়িয়ে তাঁর লেখা ১০৩ রানের সেই অনবদ্য মহাকাব্যিক ইনিংস ভারত ২৬ বছর পর লর্ডসে টেস্ট জয় নিশ্চিত করেছিল। ২০১৫ বিশ্বকাপে মেলবোর্নে দক্ষিণ আফ্রিকার ডেল স্টেইন ও মর্কেলদের বিরুদ্ধে ৬০ বলে ৭৯ রানের ঝোড়ো ইনিংস দেখিয়ে দিয়েছিল, তিনি কেবল রক্ষক নন, প্রয়োজনে সংহারকও হতে পারেন।
অজিঙ্ক রাহানের কেরিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং স্মরণীয় অধ্যায় লেখা হয়েছিল ২০২০-২১ সালের বর্ডার-গাভাসকর ট্রফিতে। অ্যাডিলেইডে মাত্র ৩৬ রানে ভারত অলআউট হওয়ার পর যখন চারদিক থেকে সমালোচনার ঝাপটা আসছিল, আর নিয়মিত অধিনায়ক বিরাট কোহলি পিতৃত্বকালীন ছুটিতে দেশে ফিরে এসেছিলেন তখন দলের দায়িত্ব তুলে নেন রাহানে। ভাঙাচোরা, চোট-আঘাতে জর্জরিত ভারতীয় দল নিয়ে তিনি মেলবোর্নে পা রাখেন। পিঠের মারাত্মক ব্যথা চেপে রেখে, ফিজিওকে কিচ্ছু না জানিয়ে নিঃশব্দে খেলে যান ১১২ রানের এক অবিশ্বাস্য ইনিংস। ওই একটি সেঞ্চুরি মেলবোর্ন টেস্ট তো বটেই, পুরো সিরিজটার গতিপথ বদলে দিয়েছিল। রাহানের ধীরস্থির নেতৃত্ব, প্যানিক না করার মানসিকতা এবং প্রতিটা সেশন ধরে এগোনের কৌশল ভারতকে সিডনিতে ঐতিহাসিক ড্র এবং পরবর্তীতে গাবার প্রাচীর ভেঙে সিরিজ জয় এনে দেয়।
ভারতের হয়ে রাহানে যে ৬টি টেস্টে অধিনায়কত্ব করেছেন, তার মধ্যে ৪টিতে জয় এসেছে এবং ২টি ড্র হয়েছে। পাঁচ বা তার বেশি টেস্টে ভারতকে নেতৃত্ব দেওয়া অধিনায়কদের মধ্যে তিনি একমাত্র, যাঁর অধীনে ভারত একটিও টেস্ট হারেনি। রাহানে মাঠের ভেতরে ও বাইরে সবসময় শৃঙ্খলাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। ২০২২ সালের দুলীপ ট্রফির ফাইনালে সতীর্থ তরুণ ব্যাটার যশস্বী জয়সওয়াল প্রতিপক্ষকে মাত্রাতিরিক্ত স্লেজিং করায় নিজের দলের ব্যাটার হওয়া সত্ত্বেও মাঠ থেকে বের করে দিতে দ্বিধা করেননি তিনি। খেলার প্রতি এই সম্মানই তাঁকে অনন্য করে রেখেছিল।
টেস্টে ‘ধ্রুপদী নোঙর’ হিসেবে পরিচিত হলেও, ২০২৩ সালের আইপিএলে চেন্নাই সুপার কিংসের জার্সিতে এক সম্পূর্ণ নতুন রাহানেকে দেখেছিল বিশ্বক্রিকেট। মহেন্দ্র সিং ধোনির অধীনে কেকেআরের বিরুদ্ধে ২৯ বলে অজেয় ৭১ কিংবা অভিষেক ম্যাচে ২৭ বলে ৬১ রানের ইনিংস খেলে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, বয়স ৩৫ পেরোলেও তাঁর ব্যাটে স্ট্রোকের ধার কমেনি। কেভিন পিটারসনের মতো তারকাও তাঁর রিভার্স স্কুপ দেখে আপ্লুত হয়ে টুইট করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
২০২৩ সালের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে চাপের মুখে ৮৯ রানের একাগ্র ইনিংস খেলার পর, ধীরে ধীরে ভারতীয় দলের দরজা বন্ধ হয়ে যায় রাহানের জন্য। গত তিন বছর ধরে দলে সুযোগ না পাওয়ার নীরব অভিমান আর হতাশা ছিল ঠিকই, কিন্তু মাঠ ছাড়ার মুহূর্তে কোনো নাটকীয়তা নয়, নিজের মতো করেই বিদায় জানালেন।
“সময়কে সম্মান করে এগিয়ে যেতে হয়। আমি সততার সঙ্গে ক্রিকেট খেলেছি। বিসিসিআই, মুম্বই ক্রিকেট সংস্থা, আমার সতীর্থ, কোচ এবং আমার স্ত্রী রাধিকাকে ধন্যবাদ। ‘অজিঙ্ক’ মানে যে হারে না, কিন্তু ক্রিকেট আমাকে হারতে শিখিয়েছে। একটা জায়গায় আমি কখনই জায়গা হারাইনি, সেটা হল আপনাদের হৃদয়।”
কলকাতা নাইট রাইডার্সের অধিনায়কত্ব করা রাহানে আগামী দিনে আইপিএল বা অন্যান্য ফ্র্যাঞ্চাইজি জার্সিতে খেলবেন কি না তা সময়ই বলবে, তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মঞ্চ থেকে এক নিঃশব্দ, শালীন ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ যোদ্ধার প্রস্থান ঘটল। ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে যখনই বিপদের দিনে অবিচল দাঁড়ানোর গল্প লেখা হবে, টুপি নম্বর ২৭৮-এর নাম সেখানে স্বর্ণাক্ষরে থাকবে।







































































































