নীরজের সঙ্গে ফাইনালে রোহিত-যশবীরও, জ্যাভলিনে ভারতের ট্রিপল ধামাকা

মুহাম্মদ শাহবাজ: কমনওয়েলথ গেমস ২০২৬-এর ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের আঙিনা থেকে ভারতীয় ক্রীড়াপ্রেমীদের জন্য ভেসে এল এক দুর্দান্ত ও অত্যন্ত আশাব্যাঞ্জক খবর। দীর্ঘ বিরতি ও প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে দেশের সোনার ছেলে তথা অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন নীরজ চোপড়া আবারও কমনওয়েলথের মঞ্চে নিজের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটিয়েছেন। পুরুষদের জ্যাভলিন থ্রো ইভেন্টের রুদ্ধশ্বাস যোগ্যতা অর্জন পর্বে নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়ে হাসিমুখে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছেন তিনি। এই লড়াইয়ে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যই নয়, বরং চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের অলিম্পিক সোনাজয়ী অ্যাথলিট আরশাদ নাদিমকে দূরত্বের নিরিখে বেশ খানিকটা পিছনে ফেলে মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেও এগিয়ে গিয়েছেন নীরজ। তবে ভারতের আনন্দের ঝুলিতে এটিই একমাত্র প্রাপ্তি নয়; কারণ এই একই প্রতিযোগিতা থেকে দেশের আরও দুই প্রতিশ্রুতিমান জ্যাভলিন থ্রোয়ার রোহিত যাদব এবং যশবীর সিংহও অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে যোগ্যতা পর্ব টপকে সেরা বারো জনের মূল লড়াইয়ে প্রবেশ করেছেন। আন্তর্জাতিক স্তরের এমন এক মেগা ইভেন্টে তিন-তিনজন ভারতীয় থ্রোয়ারের ফাইনালের টিকিট কাটা ভারতীয় অ্যাথলেটিক্সের ইতিহাসে যেমন এক অনন্য মাইলফলক, তেমনই গেমসে ভারতের পদক জয়ের আশাকে দ্বিগুণ করে তুলেছে।
যোগ্যতা অর্জন পর্বের লড়াইয়ে নামার দিন গ্লাসগোর আবহাওয়া ভারতীয় ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক অ্যাথলিটদের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জের রূপ নিয়েছিল। কনকনে ঠান্ডা, মেঘলা আকাশ এবং ট্র্যাকের উপর ক্রমাগত দিক পরিবর্তনকারী এলোমেলো হাওয়ার জেরে বর্শার সঠিক গতিপথ বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। প্রতিকূল প্রকৃতির এই প্রচণ্ড বাধার মুখে পড়ে অ্যাথলিটদের সাধারণ পারফরম্যান্সে তার প্রভাব স্পষ্ট দেখা যায়। পরিস্থিতির গুরুত্ব এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরাসরি ফাইনালে ওঠার জন্য নির্ধারিত ৮৪ মিটারের মানদণ্ড প্রতিযোগীদের কেউই স্পর্শ করতে পারেননি। প্রতি প্রতিযোগীকে তিনটি করে থ্রো করার সুযোগ দেওয়া হলেও, এই বিরূপ আবহাওয়ায় অহেতুক চোটের ঝুঁকি না নিয়ে কেবল নিজের অভিজ্ঞতার উপর ভরসা করেন নীরজ। প্রতিযোগীদের তালিকায় একদম শেষের দিকে থ্রো করতে নামায় পরিস্থিতি মূল্যায়নের কিছুটা বাড়তি সুবিধা তিনি পান। প্রথম প্রচেষ্টায় তাঁর জ্যাভলিন গিয়ে পড়ে ৭৬.২৮ মিটারে, যা ফাইনালে ওঠার নূন্যতম ৭৫ মিটারের প্রাথমিক শর্ত পূরণ করে দেয়। এর পরেই দ্বিতীয় সুযোগে নিজের টেকনিক ও শারীরিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে তিনি বর্শাকে পাঠান ৭৯.৬১ মিটার দূরে। দ্বিতীয় থ্রোতেই নিজেকে প্রথম ছয়ের মধ্যে নিশ্চিত দেখে এবং আসন্ন ফাইনালের জন্য শক্তি বাঁচানোর কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি আর তৃতীয় বার জ্যাভলিন হাতে তুলে নেননি। দুই গ্রুপের সম্মিলিত পারফরম্যান্স শেষে এই ৭৯.৬১ মিটার দূরত্বের ওপর ভর করেই যোগ্যতা পর্বে পঞ্চম স্থান অর্জন করে ফাইনালের মঞ্চে প্রবেশ করেন তিনি।
অন্যান্য প্রতিযোগীদের ক্ষেত্রে আবহাওয়ার তারতম্য এবং নিজস্ব দক্ষতার ফারাক স্পষ্ট উঠে এসেছে এই যোগ্যতা পর্বে। বিরূপ পরিবেশের মধ্যেও সবচেয়ে চমকপ্রদ সূচনা করেন শ্রীলঙ্কার প্রতিশ্রুতিমান থ্রোয়ার রুমেশ পাথিরাজ। নিজের প্রথম প্রচেষ্টাতেই ৮২.৮৪ মিটার দূরত্ব অতিক্রম করে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়ে তালিকার শীর্ষস্থানে নিজের নাম খোদাই করে নেন তিনি। তালিকায় দ্বিতীয় স্থানটি দখল করেন গ্রেনাডার বিশ্বখ্যাত জ্যাভলিন অ্যাথলিট অ্যান্ডার্সন পিটার্স, যিনি ৮১.২৯ মিটার দূরত্ব মাপেন। ৮০.৬৪ মিটার এবং ৮০.৩৮ মিটার থ্রো করে যথাক্রমে তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে নিজেদের শেষ করেন দক্ষিণ আফ্রিকার ডাউ স্মিট এবং আয়োজক দেশ ইংল্যান্ডের বেন ইস্ট। নীরজ যেখানে ৭৯.৬১ মিটার নিয়ে ঠিক তাঁদের পরেই অর্থাৎ পঞ্চম স্থান ধরে রেখেছেন, সেখানে চরম ব্যর্থতা ও হতাশার মুখোমুখি হতে হয়েছে পাকিস্তানের অলিম্পিক সোনাজয়ী অ্যাথলিট আরশাদ নাদিমকে। নিজের সেরাটা দিয়েও তিনি ৭৮.৬৩ মিটারের বেশি এগোতে পারেননি, ফলে তালিকার সপ্তম স্থানে নেমে গিয়ে ফাইনালে উঠতে হলেও দূরত্বের বিচারে তিনি নীরজের বেশ খানিকটা পিছনের সারিতেই জায়গা পেয়েছেন।
নীরজের এই মেগা পারফরম্যান্সের ছায়ায় ঢাকা পড়েননি ভারতের বাকি দুই জ্যাভলিন অ্যাথলিট। মোট আঠারো জন বিশ্বমানের অ্যাথলিটের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝে রোহিত যাদব এবং যশবীর সিংহ যেভাবে নিজেদের স্নায়ুচাপ ধরে রেখে পারফর্ম করেছেন, তা এক কথায় অসাধারণ। রোহিত যাদব ৭৮.৩৭ মিটার দূরত্ব স্পর্শ করে তালিকার নবম স্থানে নিজের নাম নথিভুক্ত করেন এবং যশবীর সিংহ ৭৮.৩৮ মিটারের এক নিখুঁত থ্রো উপহার দিয়ে ১০ম স্থানে শেষ করেন। বিশ্বের সেরা বারো জন থ্রোয়ারের ফাইনাল তালিকায় তিন ভারতীয়র এই সহাবস্থান স্পষ্ট করে দেয় যে ভারত কেবল একক তারকার উপর নির্ভর করে নেই, বরং সামগ্রিকভাবে অ্যাথলেটিক্সে এক শক্তিশালী শক্তিকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।
ফাইনালের ছাড়পত্র মিললেও, নীরজের যোগ্যতাপর্বের থ্রোয়ের দূরত্ব বিশ্ব ক্রীড়ামহলে এবং ভারতীয় সমর্থকদের মনে কিছুটা ভাবনার অবকাশ রেখে গিয়েছে। ২০১৮ সালের গোল্ড কোস্ট কমনওয়েলথ গেমসে সোনা জিতে বিশ্বমঞ্চে নিজের যে জয়যাত্রা শুরু করেছিলেন নীরজ, তাকে ধরে রাখা এখন তাঁর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। গত বার্মিংহ্যাম কমনওয়েলথ গেমসে চোটের কারণে অংশ নিতে না পারার আক্ষেপ কাটিয়ে দ্বিতীয় বার সোনার পদক নিজের গলায় পরার লক্ষ্যে এই গেমসের আগে বেশ সুসংগঠিত প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তিনি। এমনকি সুইৎজারল্যান্ডে গিয়ে টানা ৪৭ দিনের এক দীর্ঘ ও নিবিড় প্রশিক্ষণ শিবিরে ঘাম ঝরিয়েছেন এই ২৮ বছর বয়সী তারকা। কিন্তু গত সেপ্টেম্বরে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের যোগ্যতা পর্বেই যেখানে তিনি ৮৪.৮৫ মিটারের বিশাল থ্রো করে ফাইনাল নিশ্চিত করেছিলেন, সেখানে ৭৯.৬১ মিটারের দূরত্ব কিছুটা চিন্তার বৈকি। ফাইনালে সোনা ধরে রাখতে গেলে শ্রীলঙ্কার রুমেশ পাথিরাজ কিংবা গ্রেনাডার অ্যান্ডার্সন পিটার্সদের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে টেক্কা দেওয়ার জন্য নীরজকে তাঁর চেনা ছন্দে ফিরতেই হবে।
যোগ্যতা পর্বের সমস্ত হিসাব-নিকাশ, বিতর্ক ও অনিশ্চয়তাকে পিছনে ফেলে এবার চোখ রবিবার গভীর রাতের আসল যুদ্ধের দিকে। শুক্রবার গভীর রাতে (ভারতীয় সময় অনুযায়ী রাত সাড়ে বারোটা) গ্লাসগোর মূল স্টেডিয়ামে আয়োজিত হতে চলেছে ২০২৬ কমনওয়েলথ গেমসের পুরুষদের জ্যাভলিন থ্রো ইভেন্টের বহুল প্রতীক্ষিত ফাইনাল। যোগ্যতা পর্বের ভুলত্রুটিগুলো দ্রুত শুধরে নিয়ে, প্রতিকূল আবহাওয়াকে জয় করে এবং নিজেদের শতভাগ উজাড় করে দিয়ে নীরজ, রোহিত ও যশবীর এই তিন ভারতীয় বীর দেশের জন্য নতুন ইতিহাস রচনা করতে পারেন কি না, এখন সেটাই দেখার। সমগ্র ভারত এখন প্রার্থনায় মগ্ন, যাতে ‘সোনার ছেলে’ নীরজের হাত ধরে জাতীয় পতাকা আবারও কমনওয়েলথের সর্বোচ্চ চূড়ায় সম্মানের সাথে উড্ডীন হয়।











































































































