‘জাগ্রত প্রহরী’ প্রকাশে নতুন অধ্যায়, ২২তম সাহিত্য সেতুতে সম্মানিত গুণীজন

দৈনিক জনকণ্ঠ, এম নাজমুস সাহাদাত: সাহিত্য কেবল শব্দের বিন্যাস নয়, একটি সমাজের ইতিহাস, সংস্কৃতি, মানবিকতা ও মূল্যবোধের প্রতিচ্ছবি। সেই চেতনাকে ধারণ করেই রবিবার উত্তর মুর্শিদাবাদ সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্রের উদ্যোগে সাজুর মোড়ের এ.এম. টিচার ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের সভাগৃহে অনুষ্ঠিত হল ২২তম ‘সাহিত্য সেতু ও গুণীজন সম্মাননা-২০২৬’। সাহিত্য, শিক্ষা, সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত বিশিষ্টজনদের উপস্থিতিতে দিনভর অনুষ্ঠানটি যেন পরিণত হয় এক প্রাণবন্ত সাহিত্য-উৎসবে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী ও সাহিত্যপ্রেমীদের মিলনমেলায় মুখর হয়ে ওঠে সভাগৃহ। অনুষ্ঠানের শুরুতে অতিথিদের বরণ ও উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে সাহিত্য সভার সূচনা হয়। এরপর সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতির নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেন উপস্থিত অতিথিরা।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিরাট ব্যানার্জি, অরুণ পাঠক, আবু রাইহান, আহসান হাবিব, ড. সামসুন নাহার, তাজিবুর রহমান, ড. আব্দুল অহাব, মতিরুল রহমান-সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি। আলোচনায় উঠে আসে মুর্শিদাবাদ জেলার সমৃদ্ধ সাহিত্য-ঐতিহ্য এবং সেই ঐতিহ্যকে বহন করে চলা কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও গবেষকদের অবদান। বক্তারা বলেন, মুর্শিদাবাদের সাহিত্যজগৎ কেবল সৃজনশীলতার জন্য নয়, সমাজমনস্ক চিন্তা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা বহনের জন্যও সমানভাবে সমৃদ্ধ। নতুন প্রজন্মের কাছে সেই ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আজকের সাহিত্যকর্মীদেরই। আলোচনায় বিশেষভাবে স্মরণ করা হয় কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ-এর সাহিত্যকীর্তি। তাঁর জীবনসংগ্রাম, গ্রামীণ বাংলার মানুষের জীবনকে সাহিত্যে তুলে ধরার অসাধারণ দক্ষতা এবং বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন উপস্থিত সাহিত্যপ্রেমীরা। পাশাপাশি দাদাঠাকুরের ব্যঙ্গ-রস, সামাজিক সচেতনতা এবং সাংবাদিকতার প্রতি তাঁর নির্ভীক মনোভাবও আলোচনায় উঠে আসে। বক্তারা বলেন, এইসব গুণীজনের জীবন ও সাহিত্য আজও নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃতী ব্যক্তিদের সম্মাননা প্রদান। ‘সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ সম্মাননা-২০২৬’ প্রদান করা হয় মহিবুর রহমান এবং শামসুল হুদা আনার-কে। ‘দাদাঠাকুর সম্মাননা-২০২৬’-এ সম্মানিত হন সুকুমার সাহা, মতিরুল রহমান এবং কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘জাকির হোসেন সম্মাননা-২০২৬’ লাভ করেন রুকুমুদ্দিন শেখ, বাসির শেখ এবং মেহের শেখ। এছাড়া শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য মির্জাপুর হাই স্কুলের শিক্ষক বিরাট ব্যানার্জি এবং ড. আব্দুল অহাব-কে বিশেষ শিক্ষা সম্মাননা প্রদান করা হয়। সম্মানপ্রাপকদের হাতে উত্তরীয়, স্মারক ও সম্মাননাপত্র তুলে দেন অতিথিরা।
অনুষ্ঠানের আরেকটি উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ ছিল সাহিত্য পত্রিকা ‘জাগ্রত প্রহরী’-এর নতুন সংখ্যার প্রকাশ। বিশিষ্ট অতিথিদের উপস্থিতিতে পত্রিকার আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন করা হয়। পত্রিকার সম্পাদক মোফাক হোসেন বলেন, সাহিত্যকে মানুষের আরও কাছাকাছি পৌঁছে দেওয়া এবং নবীন ও প্রবীণ লেখকদের জন্য একটি মুক্ত সৃজনশীল পরিসর গড়ে তোলাই ‘জাগ্রত প্রহরী’-র মূল উদ্দেশ্য। তিনি আগামী দিনেও পত্রিকার মাধ্যমে সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চাকে আরও বিস্তৃত করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ, সাহিত্য আলোচনা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করে। নবীন কবিদের আবৃত্তি এবং প্রবীণ সাহিত্যিকদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে প্রজন্মের মধ্যে এক সুন্দর সাহিত্য-সেতুবন্ধনের ছবি ফুটে ওঠে।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত ২২ বছর ধরে উত্তর মুর্শিদাবাদ সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র ধারাবাহিকভাবে সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রসারে কাজ করে চলেছে। আগামী দিনেও সাহিত্যচর্চা, পাঠাভ্যাস বৃদ্ধি, তরুণ লেখকদের উৎসাহ প্রদান এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশে আরও বিস্তৃত কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। সাহিত্য, শিক্ষা, সাংবাদিকতা ও সমাজসেবার বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই ২২তম সাহিত্য সেতু ও গুণীজন সম্মাননা অনুষ্ঠান উত্তর মুর্শিদাবাদের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এক উজ্জ্বল সংযোজন হয়ে রইল।














































































































