প্রতিশোধ বনাম শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই: ডুরান্ড ফাইনালে মহারণের অপেক্ষায় যুবভারতী

মুহাম্মদ শাহবাজ:কলকাতা ময়দানের চিরকালীন আকর্ষণ মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গলের সেই মহাযুদ্ধ, ডার্বি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে রবিবার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের সবুজ গালিচায় মুখোমুখি হতে চলেছে এই দুই প্রধান। ডুরান্ড কাপ ফাইনালের এই হাইভোল্টেজ ম্যাচকে ঘিরে কেবল ফুটবলপ্রেমীদের গ্যালারিতেই নয়, দুই শিবিরের ড্রেসিংরুম, টিম ম্যানেজমেন্ট ও অন্দরমহলেও চলছে প্রবল স্নায়ুযুদ্ধ।
ডুরান্ড কাপের এই ফাইনাল ইস্টবেঙ্গল কোচের কাছে প্রতিশোধ ও মর্যাদার লড়াই। চলতি ডুরান্ডে ইতিমধ্যেই একবার ডার্বিতে হারের স্বাদ পেয়েছেন স্প্যানিশ হেটমাস্টার আন্তোনিও লোপেস হাবাস। এই ম্যাচের আগে তাঁর সবথেকে বড় চিন্তার কারণ নাইজেরিয়ার তারকা স্ট্রাইকার এনসুসি এফিয়ঙ্গের অনুপস্থিতি। সেমিফাইনালে খেলতে না পারা এবং দিল্লির বিরুদ্ধে অসংখ্য সুযোগ পেয়েও গোল করতে না পারার আক্ষেপ রয়েছে। শুক্রবার অনুশীলনের মাঠ না পাওয়ায় নিউ টাউনে এআইএফএফ-এর সেন্টার অফ এক্সিলেন্স পরিদর্শনে গিয়েও অনুশীলন করতে পারেননি তাঁরা। তা সত্ত্বেও যুবভারতীতে নামার আগে রুদ্ধদ্বার অনুশীলন, পাসিং ফুটবল, উইং-প্লে এবং ডামি রান ও অফ দ্য বল মুভমেন্টের ওপর কড়া জোর দিয়েছেন হাবাস। প্রাক্কলন অনুযায়ী হাবাস ৩-৫-১-১ বা প্রয়োজনমতো কৌশল বদলে দল সাজাতে পারেন। আত্মবিশ্বাসী হাবাস মাঠ ছাড়ার সময় স্পষ্ট জানিয়ে গিয়েছেন, এবার ডার্বি তাঁরাই জিতবেন।
অন্যদিকে মোহনবাগান শিবিরের অন্দরে রয়েছে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসা ক্লান্তি ও লড়াইয়ের চাপ। শিলং থেকে সড়কপথে আড়াই ঘণ্টা এবং বিমানযাত্রার মাধ্যমে কলকাতায় ফেরায় মোহনবাগান দল ও কোচিং স্টাফদের চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হয়েছিল। শিলং স্টুডেন্টস ইউনিয়ন বা কেএসইউ-এর প্রতিবাদের কারণে বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয় মোহনবাগান ফুটবলারদের, ফলে পুলিশি পাহারায় তাদের ঘুরপথে গুয়াহাটিতে নিয়ে আসা হয়। ডুরান্ড কমিটির সূচি এবং টিকিটের অপর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিয়ে ম্যানেজমেন্ট মহলে চরম অসন্তোষ রয়েছে। সেমিফাইনালে চোটের কারণে খেলতে না পারা ফরোয়ার্ড দ্রাভিচের চূড়ান্ত অবস্থার ওপর নির্ভর করছে তাঁর মাঠে নামা। শনিবার কোচ পানাইয়োতিস ডিম্পেরিস মূলত ফুটবলারদের রিল্যাক্স ও মানসিকভাবে চাঙ্গা করার ওপর জোর দিয়েছেন, যাতে ফাইনালে ক্লান্তি প্রভাব ফেলতে না পারে।
ডার্বির ফল নির্ধারণে দুই দলের গোলরক্ষকদের পারফরম্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। মোহনবাগানের বিশাল কাইথ ও ইস্টবেঙ্গলের প্রভসুখন সিং গিল উভয়েই দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন। সাম্প্রতিক রিফ্লেক্স, আত্মবিশ্বাস এবং টাই-ব্রেকার সেভ করার দক্ষতার বিচারে বিশাল কাইথ কিছুটা এগিয়ে থাকলেও, আইএসএলে গিলের ধারাবাহিকতা ও পেনাল্টি সেভ করার ক্ষমতা ইস্টবেঙ্গলকে বড় ভরসা জোগাচ্ছে। বার্দের নিচে এদের শক্তিশালী উপস্থিতি দলের রক্ষণকে অনেক বেশি নিরাপদ রাখে।
ফাইনাল ম্যাচকে ঘিরে সাধারণ সমর্থকদের উন্মাদনা আকাশছোঁয়া, যার জেরে টিকিটের জন্য হাহাকার শুরু হয়েছে। অনলাইনের পাশাপাশি ময়দানে দুই প্রধানের তাঁবু থেকে সীমিত সংখ্যক টিকিট সদস্যদের মধ্যে বণ্টন করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে পর্যাপ্ত ভিআইপি টিকিট ও কার পার্কিং না পাওয়া নিয়ে ক্লাব কর্তাদের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা গেছে। সমস্ত প্রশাসনিক জটিলতা ও প্রতিকূলতা পেরিয়ে রবিবার বিকেল পাঁচটায় যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে শুরু হতে চলেছে এই মেগা ফাইনাল।
ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ডার্বি মানেই স্মৃতি ও রোমাঞ্চের এক অনন্য মেলবন্ধন। প্রাক্তন ফুটবলার বিদেশ বসু ও মিহির বসুর মতো কিংবদন্তিরা আজও অম্লান করে রেখেছেন অতীতের ডুরান্ড ফাইনালের রোমাঞ্চকর স্মৃতি। ১৯৭৮ সালের ঐতিহাসিক ডুরান্ড ফাইনাল যেখানে ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে মোহনবাগানের লড়াই বা সুরোদার গোল আজও পুরোনো দিনের সেই আবেগকে উসকে দেয়। সেই পুরনো লড়াই আর ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার নিয়েই বর্তমান প্রজন্মের ফুটবলাররা রবিবারের ফাইনালে নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দিতে প্রস্তুত। রবিবারের এই হাইভোল্টেজ বিকেল কি সাক্ষী থাকবে নতুন কোনো ইতিহাসের, নাকি রচিত হবে পুরোনো কোনো স্মৃতির পুনরাবৃত্তি? উত্তর দেবে যুবভারতীর সবুজ গালিচা।
মেগা ফাইনাল রবিবার বিকেল ৫:০০ টায় সরাসরি সম্প্রচার সোনি স্পোর্টস নেটওয়ার্ক





















































































































