ট্রফি জয়ের পাশাপাশি একগুচ্ছ ব্যক্তিগত পুরষ্কার জিতলেন স্পেনের খেলোয়াড়রা

মুহাম্মদ শাহবাজ: নিউ জার্সি:
রবিবার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে পরাজিত করে দীর্ঘ ১৬ বছর পর ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বসেরার খেতাব অর্জন করেছে অপ্রতিরোধ্য স্পেন। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের নিখুঁত মগজাস্ত্র এবং ট্যাকটিক্যাল দক্ষতার সামনে এদিন পুরোপুরি দিশেহারা হয়ে পড়েছিল লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা, যারা ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিজেদের চেনা ছন্দের ধারেকাছেও যেতে পারেনি। খেলার প্রথমার্ধ থেকেই মাঠজুড়ে স্পেনের পাসের মহোৎসবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে আলবিসেলেস্তেরা, যেখানে পুরো নব্বই মিনিটে স্পেনের গোল লক্ষ্য করে একটিমাত্র শটও নিতে পারেনি তারা।
১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো ম্যাচে প্রথমার্ধের পুরোটা সময় প্রতিপক্ষের পেনাল্টি বক্সে একবারও বল স্পর্শ করতে ব্যর্থ হয় আর্জেন্টিনা, যা তাদের অত্যন্ত নেতিবাচক ও রক্ষণাত্মক ফুটবলেরই এক চরম লজ্জাজনক নিদর্শন হয়ে রইল। ১৯৬৬ সাল থেকে বিশ্বকাপের বিস্তারিত পরিসংখ্যান সংরক্ষণের পর এই ম্যাচে আর্জেন্টিনার বল দখলের হার নেমে আসে মাত্র ৩৪ শতাংশে, যা স্পেনের একতরফা আধিপত্য এবং নিখুঁত বল পজেশনের চিত্রটি স্পষ্ট করে তোলে। ম্যাচের পুরো সময়জুড়ে স্প্যানিশ মিডফিল্ডার ও ডিফেন্ডারদের মুহুর্মুহু আক্রমণে আর্জেন্টাইন রক্ষণভাগ প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল এবং গোলরক্ষক এমিলিয়ানো দিবু মার্টিনেজ যদি অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ৯৪ মিনিট পর্যন্ত অন্তত দশটি নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে না দিতেন, তবে হারের ব্যবধান আরও অনেক বেশি হতে পারত। ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয় অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে, যখন বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে নিকো উইলিয়ামসের বাড়ানো নিখুঁত ও অসাধারণ এক ক্রস থেকে বাঁ পায়ের বুলেটগতির জোরালো শটে স্পেনের হয়ে জয়সূচক গোলটি করেন ফেরান তোরেস।
এই ফাইনাল ম্যাচে একক নৈপুণ্য এবং ট্যাকটিক্যাল শ্রেষ্ঠত্বের সুবাদে টুর্নামেন্টজুড়ে দুর্দান্ত খেলা স্পেন দলেই সমস্ত ব্যক্তিগত পুরস্কার জমা হয়, যার মধ্যে ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন দুর্দান্ত খেলা ফেরান তোরেস, ফিফা ইয়ং প্লেয়ার অ্যাওয়ার্ড জেতেন স্পেনের উদীয়মান প্রতিভা পাও কুবারসি, সেরা গোলরক্ষকের গোল্ডেন গ্লাভস ওঠে উনাই সিমোনের হাতে এবং আসরের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল জেতেন রদ্রি, যদিও সর্বোচ্চ দশটি। গোল করে গোল্ডেন বুট নিজের দখলে রাখেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে। এই পরাজয়ের ফলে উনচল্লিশ বছর বয়সেও কাতার বিশ্বকাপের সাফল্যের পর আরও একটি সোনালী ট্রফি উঁচিয়ে ধরার লিয়োনেল মেসির আজীবন স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত অপূর্ণই থেকে গেল, যাকে গোটা ম্যাচে এতটাই নিখুঁতভাবে আটকে রেখেছিল স্পেনের ওয়ারজাবাল ও রদ্রিরা যে সতীর্থেরা তাঁকে ঠিকমতো কোনো পাসই বাড়াতে পারেননি।
মেটলাইফ স্টেডিয়ামের আকাশে তখন অদ্ভুত এক বিষণ্ণতা আর হারের গভীর হতাশায় ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পর সবুজ ঘাসের ওপর একা বসে পড়ে অঝোরে চোখের জল ফেলতে শুরু করেন ফুটবল ঈশ্বর মেসি। ঠিক সেই মুহূর্তেই স্পেনের কিশোর তারকা লামিন ইয়ামাল তাঁকে দুই হাত বাড়িয়ে মাটি থেকে তুলে নেন, যা যেন এক যুগের অবসান ঘটিয়ে ফুটবলের নতুন সাম্রাজ্য হস্তান্তরের প্রতীক হয়ে ওঠে। ম্যাচ শেষে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে মেসি কোনো রাখঢাক না রেখেই স্বীকার করেন যে স্পেন তাঁদের চেয়ে অনেক ভালো খেলেছে এবং এই জয়ে তারা সম্পূর্ণ যোগ্য দল হিসেবেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে, পাশাপাশি নিজের সকল সতীর্থ ও দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানান। টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই করা এক ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট এবং ফাইনালে এই হৃদয়ভঙ্গের পর তাঁর আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হলেও, আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর তাঁকে বিশ্বকাপে দেখা যাবে না বলেই ধরে নেওয়া হচ্ছে, যা বিশ্ব ফুটবলের এক বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের সমাপ্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে।








































































































