মদ্যপ গেটম্যানের গাফিলতিতে রেল দুর্ঘটনা, চার শিশু-সহ নিহত ৫
দৈনিক জনকণ্ঠ, এজাজ আহম্মেদ, বহরমপুর: মদ্যপ গেটম্যানের চরম গাফিলতিতে মর্মান্তিক রেল দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল পাঁচ জনের, যাদের মধ্যে চারজনই শিশু স্কুলপড়ুয়া। শোক ও ক্ষোভে উত্তাল বহরমপুরের কর্ণসুবর্ণ-গোবিন্দপুর এলাকা। শুক্রবার সকাল ৬টা ৪০ মিনিট নাগাদ হাওড়া ডিভিশনের কাটোয়া-আজিমগঞ্জ শাখার কর্ণসুবর্ণ স্টেশনের আগে ও জীবন্তি হল্টের পরে গোবিন্দপুর এলাকার ২৪এ/২ নম্বর রেলগেটে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। কাটোয়াগামী নিমতিতা-কাটোয়া প্যাসেঞ্জার ট্রেনের ধাক্কায় স্কুলপড়ুয়া বোঝাই একটি টাটাসুমো গাড়ি ও এক সাইকেল আরোহী মুহূর্তের মধ্যে দুমড়ে মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় দুই শিশু পড়ুয়া এবং কান্দি থানার ডাবকই এলাকার বাসিন্দা সাইকেল আরোহী জামশেদ শেখের (৫০)। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়। নিহত চার শিশুর নাম ফারহানা বেগম (৭), জাসিকা শবনম (৮), ইসানুর রহমান (৫) এবং তামান্না পারভিন (৭)। বর্তমানে মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন গাড়িচালক সাহেব শেখ ও পড়ুয়া আনিশা খাতুন, আর কর্ণসুবর্ণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বিশ্বেশ্বর মণ্ডল ও শামিমা খাতুন।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ আগে আপ নবদ্বীপ ধাম এক্সপ্রেস ট্রেন যাওয়ার সময় গোবিন্দপুর রেলগেট নামানো হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তী নিমতিতা-কাটোয়া প্যাসেঞ্জার ট্রেন আসার সময় গেট নামানো ছিল না এবং সেই মুহূর্তে গেটম্যানও উপস্থিত ছিলেন না। তদন্তে নেমে পুলিশ দ্রুত গেটম্যানকে গ্রেফতার করে। অভিযোগ, কর্তব্যরত গেটম্যান সেই সময় মদ্যপ অবস্থায় ছিল। খবর পেয়ে উত্তেজিত গ্রামবাসীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছালে গেটম্যান নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে থাকেন, পরে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে। কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগে গেটম্যান ও সুপারভাইজারকে তৎক্ষণাৎ সাসপেন্ড করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে পৌঁছান কংগ্রেস নেতা প্রাক্তন রেল প্রতিমন্ত্রী অধীর রঞ্জন চৌধুরী। রেলের চরম অব্যবস্থা ও পরিকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, গেটম্যানের গাফিলতিতেই এতজনের প্রাণহানি ঘটেছে, তবে ওই গেটম্যান রেলের স্থায়ী কর্মী নাকি আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে আনা হয়েছিল এবং তাঁর সঠিক প্রশিক্ষণ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
হাসপাতালে পৌঁছান জেলাশাসক আর. অর্জুন, যিনি হতাহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়ে আর্থিক সাহায্যের কথা জানান। দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে যান রাজ্যের মন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ এবং বহরমপুরের বিজেপি নেতৃত্বও। মন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করে বলেন, একজনের ভুলে এতগুলো শিশুর প্রাণ যাওয়া অত্যন্ত মর্মান্তিক ও দুঃখজনক এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে প্রতিটি রেল স্টেশনের লেভেল ক্রসিংয়ে আন্ডারপাস তৈরির ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান তিনি। মৃতদের পরিবারকে রেলের পক্ষ থেকে ১০ লক্ষ টাকা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকেও পৃথকভাবে ১০ লক্ষ টাকা, পাশাপাশি রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ৫ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করা হয়েছে। আহতদের চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্ব রাজ্য ও কেন্দ্র উভয় সরকারই নিয়েছে এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চিকিৎসার সমস্ত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। গোটা ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করেছে রেলের আধিকারিক ও বহরমপুর থানার পুলিশ এবং এলাকায় পুলিশি নিরাপত্তা মোতায়েন রয়েছে।








