মাছ ধরার ছিপে জড়িয়ে ব্যাধপাড়ার জীবন-জীবিকা
দৈনিক জনকণ্ঠ, উৎপল রায়, জলপাইগুড়ি: বাঁশের সঙ্গে বছরের পর বছর ধরে গড়ে উঠেছে জীবনের সম্পর্ক। সেই বাঁশ কেটে, ঘষে, মেপে তৈরি হয় মাছ ধরার ছিপ। আর সেই ছিপ বিক্রি করেই সংসার চলে ময়নাগুড়ির চূড়াভান্ডারের ব্যাধপাড়ার একাধিক পরিবারের। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত এলাকার প্রায় ২০টি পরিবার। পরিবারের পুরুষদের পাশাপাশি ছোট-বড় মহিলারাও হাতে হাত মিলিয়ে এই কাজে সহযোগিতা করেন।চূড়াভান্ডারের ব্যাধপাড়ায় গেলেই দেখা যায়, বাড়ির উঠোন কিংবা বারান্দায় সারি দিয়ে রাখা বাঁশ। কোথাও বাঁশ কাটার কাজ চলছে, কোথাও আবার তৈরি হচ্ছে মাছ ধরার ছিপ। সকাল থেকে পরিবারের সদস্যরা ব্যস্ত থাকেন ছিপ তৈরির কাজে। তৈরি হওয়ার পর সেই ছিপ চলে যায় বিভিন্ন বাজারে। কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি—বিভিন্ন জায়গায় এই বাঁশের তৈরি মাছ ধরার ছিপের চাহিদা রয়েছে। স্থানীয় কারিগরদের কথায়, একটি মাছ ধরার ছিপ তৈরি করতে বাঁশ কেনা থেকে শুরু করে অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রায় ২২ থেকে ২৫ টাকা খরচ হয়। এরপর প্রতিটি ছিপ ৩৫ থেকে ৪০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। প্রতিদিন একটি পরিবার গড়ে প্রায় ৬০ থেকে ৭০টি ছিপ তৈরি করতে পারে। তৈরি হওয়া ছিপের একটি বড় অংশ বাসে করে কলকাতায় পাঠানো হয়। পাশাপাশি শিলিগুড়ি ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকাতেও বিক্রি হয় এই ছিপ। এই কাজের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচা বাঁশ মূলত স্থানীয় এলাকা ছাড়াও মালবাজার, বাতাবাড়ি ও চালসা এলাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা হয়। বাঁশ সংগ্রহের পর সেটিকে প্রয়োজনমতো কেটে ও প্রস্তুত করে তৈরি করা হয় মাছ ধরার ছিপ। দীর্ঘদিন ধরে এই কাজ করতে করতে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন এলাকার কারিগররা। তাঁদের হাতের কাজেই তৈরি হয় একের পর এক ছিপ। এই পেশার সঙ্গে যুক্ত জয়দেব ব্যাধ, বিশু ব্যাধ, ভলেন ব্যাধ ও গোপাল ব্যাধরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা বাঁশের ছিপ তৈরির কাজ করছেন। এই কাজ থেকেই তাঁদের সংসার চলে। তবে কাঁচামালের দাম ও অন্যান্য খরচ বাড়লেও সেই অনুপাতে ছিপের দাম সবসময় বাড়ে না। ফলে লাভ খুব বেশি না হলেও বংশপরম্পরায় চলে আসা এই কাজ ছেড়ে অন্য পেশায় যাওয়া তাঁদের পক্ষে সহজ নয়। শুধু পুরুষরাই নন, এই কাজে পরিবারের মহিলাদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আগমনি ব্যাধ, পবিত্রা ব্যাধদের মতো এলাকার বহু মহিলা পরিবারের পুরুষদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে ছিপ তৈরির কাজে যুক্ত রয়েছেন। সংসারের কাজ সামলে অবসর সময়ে তাঁরা বাঁশ প্রস্তুত করা, ছিপ তৈরির বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করেন। ব্যাধপাড়ার বাসিন্দাদের কাছে এই কাজ শুধু একটি পেশা নয়, বরং দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই হস্তশিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাঁদের জীবিকা ও পারিবারিক সংস্কৃতি। আধুনিকতার যুগে নানা ধরনের তৈরি মাছ ধরার সরঞ্জাম বাজারে এলেও বাঁশের তৈরি ছিপের চাহিদা এখনও রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে মাছ ধরার শখ যাঁদের রয়েছে, তাঁদের কাছে এই ছিপের আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। তবে এই পেশাকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহযোগিতা এবং বাজারের আরও ভালো সুযোগের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন কারিগররা। তাঁদের দাবি, সরাসরি বড় বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হলে এবং ন্যায্য দাম পাওয়া গেলে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলির আয় আরও বাড়তে পারে। পাশাপাশি বাঁশের জোগান সহজ হলে উৎপাদনও বাড়ানো সম্ভব হবে। চূড়াভান্ডারের ব্যাধপাড়ার এই পরিবারগুলি তাই আজও বাঁশের ছিপ তৈরি করে জীবিকার চাকা সচল রেখেছে। প্রতিদিনের পরিশ্রমে তৈরি হওয়া সেই ছিপ দূর-দূরান্তের বাজারে পৌঁছে দিচ্ছে তাঁদের হাতে তৈরি কাজের পরিচয়। সামান্য লাভের মধ্যেও ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে চলেছেন তাঁরা। বাঁশের তৈরি এই মাছ ধরার ছিপ তাই শুধু একটি সরঞ্জাম নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রায় ২০টি পরিবারের জীবন-জীবিকা, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন।








