চরম নির্যাতন ও দারিদ্র্যকে হারিয়ে সোনা, অদম্য ইচ্ছাশক্তির নতুন নাম শর্মিলা ধনকর

দৈনিক জনকন্ঠ, মুহাম্মদ শাহবাজ: শৈশবে মারণ ব্যাধি পোলিও, পরিবারের তীব্র অনটন, আর তার ওপর যৌবনে পা দিয়ে চরম গার্হস্থ্য নির্যাতন জীবনের প্রতি পদে পদে বাঁধা তৈরি করেছিল অন্ধকার। কিন্তু সেই সমস্ত অপমান, কান্না আর অন্ধকারকে পেছনে ফেলে আজ ইতিহাস গড়েছেন ভারতীয় প্যারা-অ্যাথলিট শর্মিলা ধনকর। গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত ২০২৬ কমনওয়েলথ গেমসে মহিলাদের এফ-৫৭ প্যারা শটপুটে ৯.৮১ মিটার দূরত্বে শটপুট ছুড়ে স্বর্ণপদক ছিনিয়ে নিয়েছেন তিনি। এই অসাধারণ জয়ের মাধ্যমে দেশের প্রথম মহিলা ক্রীড়াবিদ হিসেবে প্যারা-অ্যাথলেটিক্সে সোনা জেতার এক ঐতিহাসিক অনন্য নজির গড়লেন ৪০ বছর বয়সি এই লড়াকু নারী। ১৯৮৬ সালের ১৫ আগস্ট হরিয়ানার মহেন্দ্রগড় জেলার চিত্রৌলি গ্রামে এক অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্ম শর্মিলার। বাবা ছিলেন পেশায় এক সামান্য কৃষক এবং মা ছিলেন সম্পূর্ণ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। শৈশবেই তাঁর জীবনে নেমে আসে প্রথম বড় আঘাত মাত্র দুই বছর বয়সে পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে ডান পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চিকিৎসার টাকা তো দূরের কথা, দু’বেলা অন্নসংস্থান করতেই পরিবারকে হিমশিম খেতে হতো। “বেঁচে থাকার জন্যই কোনো সম্বল ছিল না আমাদের, জীবন ছিল চরম কঠিন” শৈশবের দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে আজও কেঁপে ওঠে শর্মিলার কণ্ঠ।
১৯ বছর বয়সে শর্মিলার বিয়ে হলেও তা সুখের মুখ দেখায়নি। প্রথম স্বামী ছিলেন চরম মাদকাসক্ত এবং অত্যাচারী। দুই কন্যাসন্তানের জন্ম দেওয়ার অপরাধে প্রতিনিয়ত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো তাঁকে। শর্মিলার কথায়, “এক রাতে আমার প্রথম স্বামী রাত ১১টা থেকে ভোর ৩টে পর্যন্ত একটানা আমাকে মারধর করেন। তারপর দুই কন্যাসন্তানসহ আমাকে মধ্যরাতে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়।”
সেই রাতে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর তিনি আর কখনও সেই নরকে ফিরে যাননি। প্রায় ছয় বছর বাপের বাড়িতে আশ্রয়ে কাটিয়েছেন চরম কষ্টের মধ্য দিয়ে। জীবন যেখানে থমকে দাঁড়িয়েছিল, সেখান থেকেই শুরু হয় শর্মিলার নতুন অধ্যায়। অজিত সিংয়ের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর শর্মিলার জীবন আমূল বদলে যায়। স্বামীর অকৃত্রিম ভালোবাসা ও অদম্য উৎসাহে জীবনের এক নতুন পথ খুঁজে পান তিনি। জীবনের চরম বাধা কাটিয়ে ৩৪ বছর বয়সে তিনি পা রাখেন খেলাধুলোর দুনিয়ায়। রেওয়ারীতে বিখ্যাত কোচ টেক চাঁদ ও দেবেন্দ্রের কাছে শটপুট ও ডিসকাস থ্রো-এর কঠিন প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন শর্মিলা। স্বর্ণজয়ের ঐতিহাসিক পথচলা খেলার মাঠে নামার পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি এই অ্যাথলিটকে, প্যারা ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে অভিষেক ঘটেই জাতীয় রেকর্ড গড়ে সোনা জেতেন। ২০২২ বার্মিংহাম কমনওয়েলথ গেমস ও এশিয়ান গেমসে সামান্যর জন্য পদক হাতছাড়া হয়ে চতুর্থ স্থানে শেষ করেন। কিন্তু তিনি দমে যাননি। ২০২৫ ইন্ডিয়ান ওপেন প্যারা অ্যাথলেটিক্সে ৯.৭৭ মিটার থ্রো করে সোনা জেতেন। ২০২৬ গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমস বহু কাঙ্ক্ষিত সেই মঞ্চে ৯.৮১ মিটার ছুড়ে ভারতের ঝুলিতে এনে দেন ঐতিহাসিক গোল্ড মেডেল। সোনার পদক জয়ের পর আবেগঘন কণ্ঠে শর্মিলা বলেন- ”খেলাধুলো আমায় দ্বিতীয় জীবন দিয়েছে। এই সোনা কেবল আমার একার নয়, এই জয় তাদের জন্য একটি বার্তা যাঁরা কন্যাসন্তানকে অবহেলা করেন বা পাত্তা দেন না। কন্যাসন্তানদের যদি সামান্য ভালোবাসা ও সমর্থন দেওয়া হয়, তবে তারা ছেলেদের থেকেও বড় কীর্তি অর্জন করে দেখাতে পারে।”
“পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলেও, মানুষের ভেতরের আলো কখনো নেভে না।” — জীবনানন্দ দাশের এই গভীর দর্শনের এক জীবন্ত রূপ শর্মিলা ধনকর। শরীর বা ভাগ্য যে মানুষকে আটকে রাখতে পারে না, গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসের সোনাজয়ী এই ভারতীয় অ্যাথলেট আজ তা বিশ্ববাসীর সামনে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।






















































































































