অপরাজেয় সুফিয়া: বীর জওয়ানদের উৎসর্গ করে ৫ হাজার কিমি পথ জয়ের লক্ষ্যে

দৈনিক জনকন্ঠ, মুহাম্মদ শাহবাজ: ”একটি জঙ্গলে দুটি পথ দুদিকে চলে গিয়েছিল,আর আমি সেই পথটাই বেছে নিলাম যা দিয়ে কম লোক যাতায়াত করে। আর তাতেই সব পরিবর্তন এসেছে।” কবি রবার্ট ফ্রস্টের বিখ্যাত কবিতা ‘দ্য রোড নট টেকেন’-এর এই পঙক্তিগুলো যেন ভারতীয় আল্ট্রা-রানার সুফিয়া সুফি-র জীবনেরই প্রতিফলন।
দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এভিয়েশন সেক্টরের আরামদায়ক কেবিন ক্রু বা গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের চাকরি। মাস শেষে নিশ্চিত মোটা অঙ্কের বেতন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের আরাম আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতোই গুছিয়ে নেওয়া এক জীবন।
বাঁধাধরা জীবনের ছক ভেঙে তিনি হেঁটেছেন সম্পূর্ণ অন্য পথে। যে পথে রয়েছে মাইলের পর মাইল ক্লান্তি, প্রতিকূল আবহাওয়া আর চরম শারীরিক পরীক্ষা কিন্তু দিনশেষে সেখানেই লুকিয়ে ছিল তাঁর মুক্তি আর বিশ্বজয়ের গল্প।
১৯৮৭ সালে রাজস্থানের আজমীরে জন্ম সুফিয়ার। মাত্র ১৬ বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। বাবা মারা যাওয়ার পর তাঁর মা একাই চরম প্রতিকূলতার মধ্যে তাঁকে লালন-পালন করেন। পড়াশোনা শেষে সুফিয়া দিল্লির বিমান শিল্পে কেবিন ক্রু হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। কিন্তু নাইট শিফটের কাজ, একঘেয়ে রুটিন আর মানসিক অবসাদ ধীরে ধীরে তাঁর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটাচ্ছিল।
২০১৭ সালে এই রুটিন থেকে মুক্তি পেতে তিনি জীবনের প্রথমবার একটি পার্কে গিয়ে দৌড়ানো শুরু করেন মাত্র ৩ কিলোমিটার। এই একটি পদক্ষেহই তাঁর জীবন বদলে দেয়। কোনো রকম পেশাদার সরঞ্জামের তোয়াক্কা না করে তিনি দৌড়কেই বেছে নেন নিজের ধ্যান জ্ঞান হিসেবে। ২০১৭ সালেই নিজের চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি দৌড়ে মনোনিবেশ করার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন সুফিয়া।
একটি মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসে সুরক্ষিত চাকরি ছেড়ে দেওয়া সহজ ছিল না। পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ সবার মনেই ছিল হাজার প্রশ্ন ও সন্দেহ। আল্ট্রা-রানিং বিষয়টি তখন অনেকের কাছেই অজানা ছিল। তার ওপর একজন নারী হয়ে একাকী হাজার হাজার কিলোমিটার রাস্তায় দৌড়ানো, নিরাপত্তার ঝুঁকি এবং কোনো আর্থিক স্পনসরশিপ না থাকা সব মিলিয়ে পথটা ছিল ভীষণ কঠিন। কিন্তু সুফিয়ার অদম্য জেদ ও নিজের ওপর বিশ্বাসই তাঁকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেছে।
সুফিয়া শুধু দৌড়াননি, ইতিহাস গড়েছেন। ২০২৫ সাল পর্যন্ত তাঁর ঝুলিতে জমা হয়েছে ৫টি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড, ২০১৯ সালে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত ৪,০০০ কিলোমিটার (পরে প্রায় ৬,০০০ কিলোমিটার নেটওয়ার্ক ও দূরত্বের পথ ধরে) পথ মাত্র ৮৭ দিন, ২ ঘণ্টা ও ১৭ মিনিটে অতিক্রম করে দ্রুততম নারী হিসেবে গিনেস রেকর্ড গড়েন। গোল্ডেন কোয়াড্রিল্যাটারাল (২০২১) দিল্লি, কলকাতা, মুম্বাই ও চেন্নাই সংযোগকারী ৬,০০২ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘গোল্ডেন কোয়াড্রিল্যাটারাল’ মহাসড়ক নেটওয়ার্ক মাত্র ১১০ দিন, ২৩ ঘণ্টা ও ২৪ মিনিটে সম্পন্ন করেন। (২০২১/২০২২) সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে হাজার হাজার ফুট উঁচুতে মানালি-লেহ-র ৪৮০/৪৮৫ কিলোমিটারের অন্যতম দুর্গম ও বিপজ্জনক পাহাড়ি পথ মাত্র ৯৮ ঘণ্টা ২৭ মিনিটে (অন্য এক হিসেবে ৬ দিন, ১২ ঘণ্টা ও ৬ মিনিটে) অতিক্রম করে দ্রুততম ক্রীড়াবিদ (পুরুষ বা নারী) হিসেবে ইতিহাস গড়েন। (২০২৩/২০২৪) কাতার জুড়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে ২০০ কিলোমিটার পথ মাত্র ৩০ ঘণ্টা ৩১ মিনিটে দৌড়ে অতিক্রম করেন (২০১৮) এক পঞ্জিকা বছরে একজন নারী হিসেবে সর্বাধিক ম্যারাথন দৌড়ানোর রেকর্ড।
দীর্ঘ দূরত্বের দৌড়ে শুধু শারীরিক সক্ষমতাই শেষ কথা নয়, আসল পরীক্ষা মানসিক দৃঢ়তার। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী দৌড়ানোর সময় নির্মাণাধীন সড়কের ধুলাবালি ও প্রতিকূলতায় অসুস্থ হয়ে পড়েন সুফিয়া। তাঁর বাম ফুসফুস অকার্যকর হয়ে পড়ায় হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় ৪-৫ দিন। চিকিৎসকরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন দৌড় বন্ধ করতে। কিন্তু অদম্য সংকল্প নিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়েই কোনো বিরতি না দিয়ে আবার ৪৪ কিলোমিটার দৌড়ে নিজের যাত্রা সম্পন্ন করেন তিনি।
সুফিয়ার প্রতিটি বড় অভিযানের পেছনে থাকে একটি গভীর উদ্দেশ্য। তাঁর ‘রান ফর ড্রিমস’ প্রজেক্টের আওতায় কন্যাকুমারী থেকে কারাকোরাম পাস পর্যন্ত প্রায় ৫,০০০ কিলোমিটারের যাত্রা ছিল ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। দেশের সীমান্তে চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেই তাঁর এই দূরপাল্লার দৌড়। সুফিয়ার মতে –
”দৌড়ানো হলো নিজের সাথে হওয়া সবচেয়ে সৎ কথোপকথন।” সুফিয়া সুফি বর্তমানে তাঁর জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ এবং কঠিনতম অভিযান “রান ফর ড্রিমস” এর চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছেন। এটি তাঁর ষষ্ঠ বিশ্ব রেকর্ড গড়ার অভিযান, যা তিনি ১২ মে ২০২৬ তারিখে ভারতের দক্ষিণতম বিন্দু কন্যাকুমারী থেকে শুরু করেছিলেন। সুফিয়া কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর পর্যন্ত ৪,১৬৭ কিলোমিটার পথ মাত্র ৬৮ দিন ২৩ ঘণ্টায় দৌড়ে শেষ করে একটি নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়েছেন। এই দীর্ঘ যাত্রায় তীব্র গরম ও অবিরাম বৃষ্টি উপেক্ষা করে তিনি প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার পথ দৌড়েছেন। কাশ্মীরে পৌঁছালেও সুফিয়ার এই দৌড় কিন্তু শেষ হয়নি। তিনি কাশ্মীর (শ্রীনগর) থেকে এখন উত্তরের দিকে ঘুরে গেছেন এবং লাদাখের অত্যন্ত দুর্গম ও বরফাবৃত কারাকোরাম পাসের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। আগামী আগস্টের শুরুতে প্রায় ৫,০০০ কিলোমিটারের এই মহাকাব্যিক অভিযানটি সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। সুফিয়ার এই পুরো মিশনটি ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর বীর জওয়ানদের উৎসর্গ করা হয়েছে। পুরো যাত্রাপথে তিনি বিভিন্ন ওয়ার মেমোরিয়াল (যুদ্ধ স্মারক) পরিদর্শন করছেন এবং তাঁর সুরক্ষায় ভারতীয় সেনা ও সিআরপিএফ জওয়ানরা লজিস্টিক সহায়তা দিচ্ছেন।কাশ্মীরে পৌঁছানোর পর তেরঙা পতাকা হাতে সুফিয়া বলেন, “এই বিশ্ব রেকর্ডটি সেই প্রতিটি মানুষের যারা আমার ওপর বিশ্বাস রেখেছিলেন, আমার সাথে দৌড়েছিলেন এবং রাস্তার পাশ থেকে আমাকে উৎসাহিত করেছিলেন।” তবে এখানেই তাঁর যাত্রা শেষ নয়, কারাকোরামের বরফাবৃত দুর্গম লক্ষ্যের দিকে তাঁর পা এগিয়ে চলেছে।
সুফিয়া সুফির এই গল্প আমাদের শেখায় যে, জীবনের আসল প্রতিযোগী বাইরের কেউ নয়, বরং আমরা নিজেরা। আরামদায়ক জীবন ছেড়ে স্বপ্নের পেছনে দৌড়ানোর জন্য যে অদম্য সাহসের প্রয়োজন হয়। সুফিয়া একজন আল্ট্রা-রানার নন; তিনি সাহসিকতা, অধ্যাবসায় এবং বাধা ভাঙার এক জ্যান্ত প্রতীক। নিজের উদ্দেশ্য আর আবেগকে একসুতোয় গেঁথে তিনি প্রমাণ করেছেন – সংকল্প দৃঢ় হলে কোনো পথই দুর্গম নয়।









































































































