৭০ বছরেও অক্লান্ত লেখক ডা. শামসুল হক

বিশেষ প্রতিবেদন
নতুন পয়গাম: ডা. শামসুল হক-এর জন্ম ১৯৫৫ সালের ২৯শে এপ্রিল। খুবই সংগ্রামী জীবন। শৈশবকাল বাদ দিলে তার পরের দিনগুলোর কিছুটা অংশ কেটেছে নানা ধরনের ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্য দিয়েই। স্কুল জীবনে তার প্রভাব তেমন একটা না পড়লেও কলেজ জীবনে কিন্তু সেটা আছড়ে পড়েছিল তাঁর মনের দুয়ারে। তাই তখন নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি দিন যাপনের জন্য করতে হয়েছিল নানা ধরনের কাজকর্ম। সকাল-বিকেল যেটুকু সময় মিলত, তাতে হয় টিউশনি, নয়ত ছোট কোন কাগজের দপ্তরে কাজ নিতে হয়েছিল।
সেজন্য অবশ্য বাড়ির অভিভাবকের ওপর কোন অভিযোগ বা অভিমান কোনকালেই ছিল না। বিশাল এক পরিবার। শামসুল সাহেবরা ছিলেন দশ ভাই-বোন। অন্যান্যদের মিলিয়ে একান্নবর্তী পরিবারের মোট সদস্য সংখ্যা ছিল কুড়ি জন। একজনের রোজগারের ভরসায় না থেকে তাই নিজেরটা নিজেকেই বুঝে নিতে হয়েছিল।
কলকাতার প্রতিষ্ঠিত এক আয়ুর্বেদ কলেজ থেকে স্নাতক হন তিনি। প্রথম বর্ষ থেকেই সেই সময়ের বহুল প্রচলিত সংবাদপত্র দৈনিক বসুমতী-র নিজস্ব সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করে হাতে আসত কিছু অর্থ। ছোট-বড় অনেক কাগজ এবং পত্র-পত্রিকায় গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি লিখেও মিলত কিছু টাকা-পয়সা। সঙ্গে টিউশনি, আবার একটা সাপ্তাহিক কাগজে একটু সময় দেওয়া। তাতে নিজের পড়াশোনা, হস্টেল খরচ ইত্যাদি চলে যেত কোনক্রমে। তা থেকেই ছোট ভাই-বোনদের পড়াশোনার জন্য সামান্য হলেও কিছু পাঠাতেন বাড়িতে।
এভাবেই অতি কষ্টে কেটে গিয়েছিল পাঁচ-ছটা বছর। ইতিমধ্যে চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্নাতক হওয়ার পর সরকারি হাসপাতালের ইন্টার্ন হিসেবে কাজ শুরু করেন। তাতে পাওয়া গেল নিশ্চিত আয়ের সুযোগও। অগত্যা তখন টিউশনি ছাড়লেন। বেড়ে গেল লেখালেখির প্রতি ঝোঁক বা মাত্রা। সেই সঙ্গে বাড়ল বিভিন্ন সংবাদপত্রের দপ্তরে যাতায়াতও। নিজও শুরু করলেন একটা ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকার প্রকাশনা।
ইন্টার্নশিপ এবং হাউস ফিজিশিয়ানশিপ শেষ করে সরকারি কোন হাসপাতালে চাকরির চেষ্টা না করে কলকাতার প্রখ্যাত একটা ঔষধ প্রস্তুতকারক সংস্থার আয়ুর্বেদ বিভাগে গবেষণার কাজে যুক্ত হলেন তিনি। উদ্দেশ্য একটাই, কলকাতা ছাড়লে হবে না। বাধা পড়বে না লেখালেখির কাজও। সেখানে সুনামের সঙ্গে কাজ করলেন দীর্ঘ ত্রিশটা বছর। চাকরি পাওয়া এবং সাহিত্য জগতে মোটামুটিভাবে প্রতিষ্ঠা লাভের পর শুরু করলেন সংগ্রামী জীবনের দ্বিতীয় ইনিংস। সময়ের দাবি মেনে একটা সুখী সংসারের স্বপ্ন দেখলেন ডা. শামসুল হক। আর তা দেখতে দেখতেই ভাবের ঘরে কখন যে সুখী ভোরের ফুটন্ত একটা গোলাপ হয়ে উঠেছিলেন, তা নিজেই বুঝে উঠতে পারেননি। অবশেষে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সংসারী হলেন। বরাত জোরে সাহিত্যপ্রেমী একজনকেই পেয়েছিলেন জীবনসঙ্গী হিসেবে।
ইতিমধ্যে তাঁর জীবনে ঘটে যায় বিরাট একটা ছন্দপতন। হঠাৎই আক্রান্ত হন দূরারোগ্য কোলন ক্যান্সারে। ফলে অপারেশনের ঝামেলা, দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা করানো। কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন ইত্যাদির মধ্যেই কেটে গেছে দীর্ঘ একটা বছর। লেখালেখি বন্ধ। নির্দিষ্ট সময়ের আগে অবসর নিতে হয়েছে চাকরি থেকে।
সেইসময় চাকরি ছাড়ার যন্ত্রণা কিন্তু তাঁকে একটুও উদ্বিগ্ন করেনি বা ভাবায়নি। কিন্তু লেখালিখির সঙ্গে দূরত্ব বেড়ে যাওয়াটাকে কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারছিলেন না তিনি। আত্মীয় স্বজনদের চাপেই সেই কাজ থেকে বিরত থাকতে হয়েছিল। কিন্তু তারপর কেউই আর তাঁকে থামিয়ে বা দমিয়ে রাখতে পারেননি। বেড়ে গিয়েছিল কলমের দুর্বার গতি। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ পেতে থাকে তাঁর বিভিন্ন ধরনের লেখাও। তাঁর লেখা মলাটবন্দি হয়ে প্রকাশিত হয় অনেকগুলি গ্রন্থও। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, বিজ্ঞান, চিকিৎসা বিষয়ক ইত্যাদি মিলিয়ে ডা. শামসুল হকের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা বাইশটি। এখন ৭০ বছর বয়সেও তিনি একজন নিরলস ও অক্লান্ত লেখক। এখনও তাঁর মূল্যবান লেখালিখি বিভিন্ন দৈনিক ও সাময়িক পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে চলেছে।





















































































































