নতুন পয়গাম, হাসান লস্কর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা: ভারত-বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন নদীমাতৃক দেশে মৎস্যজীবীদের জীবন ও জীবিকা সম্পূর্ণভাবে নদী ও সমুদ্রনির্ভর। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ এবং ইলিশের প্রজনন ও বংশবিস্তার রক্ষায় নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা (ব্যান পিরিয়ড) জারি থাকায় মৎস্যজীবীরা বর্তমানে চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছেন। এই পরিস্থিতিতে বিকল্প কর্মসংস্থান গড়ে তোলাই সময়ের অন্যতম বড় প্রয়োজন হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ইলিশের প্রজনন রক্ষায় বছরে কয়েক মাস মাছ ধরা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় ওই সময় জেলেরা কার্যত বেকার হয়ে পড়েন। পাশাপাশি সাইক্লোন, নিম্নচাপ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সমুদ্রে যাওয়া সম্ভব না হওয়ায় দীর্ঘদিন আয়ের পথ বন্ধ থাকে। এর ফলে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ রোধ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে জেলেদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি।
আরও পড়ুন:


এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ ২৪ পরগনার কুলতলীতে মৎস্যজীবীদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে কুলতলী পঞ্চায়েত সমিতি। ইতিমধ্যেই শতাধিক মৎস্যজীবীকে প্রশিক্ষণ কর্মশালার মাধ্যমে বিকল্প শ্রমদিবস সৃষ্টির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। বিকল্প কর্মসংস্থানের মধ্যে অন্যতম হলো—ক্ষুদ্র কৃষিকাজ, পশুপালন এবং হাঁস-মুরগি পালন। উপকূলীয় এলাকায় কম পুঁজিতে বাড়ির আঙিনায় হাঁস পালন বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। উন্নত জাতের হাঁস পালন জেলে পরিবারের মহিলাদের জন্য বাড়তি আয়ের উৎস হিসেবে দেখা দিচ্ছে। পাশাপাশি দুধ উৎপাদন ও স্থানীয় বাজারের চাহিদা মাথায় রেখে গবাদি পশুপালনও লাভজনক বিকল্প হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
এছাড়া আধুনিক কৃষি পদ্ধতিতে বসতবাড়িতে সবজি চাষ, একই জমিতে ধান ও মাছ চাষ এবং মুক্ত জলাশয়ে বা বড় পুকুরে খাঁচায় মাছ চাষের মাধ্যমে মৎস্যজীবীরা নিজেদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পারছেন। এতে একদিকে পারিবারিক পুষ্টির চাহিদা মেটানো যাচ্ছে, অন্যদিকে বাজারে বিক্রির মাধ্যমে আয়ও বাড়ছে। মাছ ধরার অফ-সিজনে উন্নত মানের জাল তৈরি ও মেরামত, বাঁশ ও বেতের কাজ, নকশিকাঁথা ও মোমবাতি তৈরির মতো ক্ষুদ্র শিল্পেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে শুটকি তৈরি ও বাজারজাতকরণের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। কারিগরি ও সেবামূলক ক্ষেত্রেও সুযোগ তৈরি হচ্ছে— যান্ত্রিক নৌযানের ইঞ্জিন মেরামত, ছোট ওয়ার্কশপ স্থাপন এবং তরুণ মৎস্যজীবীদের কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শহরের বিভিন্ন শিল্পে কাজের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে।
আরও পড়ুন:


পশ্চিমবঙ্গ সরকার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ দপ্তরের মাধ্যমে জেলেদের জন্য একাধিক প্রকল্প চালু করেছে। নিষেধাজ্ঞার সময় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, জনপ্রতিনিধি ও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিদের সহায়তায় সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে, যাতে জেলেরা বিকল্প আয়ের পথে এগোতে পারেন। তবে এই উদ্যোগের পথে কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। বিকল্প কাজ শুরু করার জন্য প্রাথমিক মূলধনের অভাব, পর্যাপ্ত কারিগরি জ্ঞানের ঘাটতি, উৎপাদিত পণ্য ন্যায্য দামে বাজারজাতকরণের সমস্যা এবং লোনা পানির অনুপ্রবেশের কারণে কৃষি ও মিষ্টি পানির মাছ চাষে বাধা—এই সবই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
আরও পড়ুন:


এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহলের মত, শুধু প্রশিক্ষণ নয়, বরং হাঁস-মুরগি বা কৃষি উপকরণ সরাসরি প্রদান, জেলেদের নিজস্ব সমিতি গড়ে তুলে বিপণন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা নিষেধাজ্ঞার সময় ক্ষতি মোকাবিলায় বিশেষ বীমা চালু করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকারি প্রকল্পগুলির সুবিধা তৃণমূল স্তরের মৎস্যজীবীদের কাছে পৌঁছে দিলে এই উদ্যোগ আরও সফল হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মৎস্যজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থান শুধু তাদের দারিদ্র্য বিমোচনেই সহায়ক হবে না, একই সঙ্গে দেশের মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সঠিক পরিকল্পনা ও নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে মৎস্যজীবীদের জীবনযাত্রার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব।






















































































































