গাজা গণহত্যার নেপথ্যে বহু নামজাদা সংস্থা

রাষ্ট্রসংঘের রিপোর্টে ফাঁস ৫০ কোম্পানির নাম
নতুন পয়গাম,
জেনেভা, ১৮ সেপ্টেম্বর: ফিলিস্তিনে নিযুক্ত রাষ্ট্রসংঘের বিশেষ দূত ফ্রানচেস্কা আলবেনিজ এক নতুন রিপোর্টে এমন অনেক প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করেছেন, যারা ফিলিস্তিনি জনগণকে বাস্তুচ্যুত করা ও গাজায় চলমান গণহত্যায় ইসরাইলকে সহায়তা করছে। প্রতিবেদনটি বৃহস্পতিবার জেনেভায় সাংবাদিক সম্মেলনে পেশ করা হয়। এতে ৪৮টি প্রতিষ্ঠানের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে আমেরিকার মাইক্রোসফট, অ্যালফাবেট ইনকর্পোরেটেড (গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান) ও অ্যামাজন ইত্যাদি। এই তদন্তের অংশ হিসেবে এক হাজারেরও বেশি কর্পোরেট সংস্থা, প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির একটি ডেটাবেস তৈরি করা হয়েছে।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘ইসরাইলের এই আগ্রাসন ও দখলদারিত্ব অস্ত্র প্রস্তুতকারক ও বড় মাপের তথ্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার ল্যাবরেটরি হয়ে উঠেছে। সেখানে নেই কোনো জবাবদিহিতার প্রশ্ন। বিনিয়োগকারী সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষ মারা কল ফেঁদে নির্বিঘ্নে মুনাফা লুটছে।
ইসরাইল বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র-ক্রেতা দেশ হয়ে উঠেছে। এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ৮টি দেশের ১৬০০-রও বেশি প্রতিষ্ঠান। এসব বড় প্রতিষ্ঠান এখন আর শুধু ইসরাইলের দখলদারিত্বের অংশীদার নয়; বরং গণহত্যার নেপথ্যে অর্থনৈতিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। গাজায় কেন এতদিন ধরে ইসরাইলি গণহত্যা অব্যাহত রয়েছে? জবাবে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, এই গণহত্যা অনেকের জন্য মুনাফাদায়ক বা লাভজনক হয়ে উঠেছে।
এছাড়াও ইসরাইলের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আমেরিকার নামজাদা ‘লকহিড মার্টিন’ কোম্পানি। ইতালির লিওনার্দো এসপিএ সামরিক খাতে অন্যতম জোগানদাতা এবং জাপানের এফএএনইউসি কর্পোরেশন অস্ত্র তৈরির রোবোটিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে। প্রযুক্তি খাতও ইসরাইলের পক্ষে ন্যক্কারজনক ভূমিকা রাখছে। ফিলিস্তিনিদের বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণের মতো ইসরাইলের বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে তারা। মাইক্রোসফট, অ্যালফাবেট ও অ্যামাজন ইসরাইলকে তাদের ক্লাউড এবং এআই প্রযুক্তির পূর্ণাঙ্গ সরকারি ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে।
মার্কিন সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান আইবিএম ইসরাইলের সামরিক ও গোয়েন্দা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং ইসরাইলের জনসংখ্যা, অভিবাসন ও সীমান্ত কর্তৃপক্ষের ডেটাবেস পরিচালনা করছে, যাতে ফিলিস্তিনিদের বায়োমেট্রিক তথ্য সংরক্ষিত।
মার্কিন সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান ‘পালানটির টেকনোলজিস’ ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরাইলি সেনাবাহিনীকে প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়িয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান ‘স্বয়ংক্রিয় পূর্বাভাসমূলক পুলিশি প্রযুক্তি’ সরবরাহ করেছে, যা যুদ্ধক্ষেত্রে এআই-এর সাহায্যে টার্গেট তৈরি করে। যেমন ‘লেভেন্ডার’, ‘গোসপেল’ ও ‘হোয়ার ইজ ড্যাডি’ ইত্যাদি নামের এআই সিস্টেম।
প্রতিবেদনে আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে, যারা বেসামরিক প্রযুক্তি তৈরি করলেও সেগুলো ইসরাইলি আগ্রাসান বা দখলদারিত্বে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্যাটারপিলার, রাডা ইলেকট্রনিক ইন্ডাস্ট্রিজ, দক্ষিণ কোরিয়ার এইচডি হুন্ডাই, সুইডেনের ভলভো গ্রুপ ইত্যাদি। এসব প্রতিষ্ঠান ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ভাঙচুর ও পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি নির্মাণে ব্যবহৃত ভারী যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে।
বুকিং ডট কম ও এয়ার-বিএনবি প্ল্যাটফর্মগুলো অবৈধ বসতিতে ঘরবাড়ি ও হোটেলের তালিকা দিয়ে ইসরাইলি দখলদারিত্বকে স্বীকৃতি দেয়। আমেরিকার ড্রামন্ড কোম্পানি ও সুইজারল্যান্ডের গ্লেনকোর – এই দুই প্রতিষ্ঠান কলম্বিয়া থেকে কয়লা সরবরাহ করে, যা ইসরাইলের বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
কৃষি খাতে চীনের ‘ব্রাইট ডেয়ারি অ্যান্ড ফুড’ ইসরাইলের বৃহত্তম খাদ্য সংস্থা ‘নুভা’র মালিক। প্রতিষ্ঠানটি ফিলিস্তিনি জমি দখল করে গড়ে তোলা অবৈধ স্থাপনায় লাভবান হয়। মেক্সিকোর ৮০ শতাংশ মালিকানাধীন ‘নেটাফিম’ ইসরাইলি প্রতিষ্ঠান ‘অর্বিয়া অ্যাডভান্স করপোরেশন’-এর কাছে পশ্চিম তীরে পানি উত্তোলন ও ফিল্টার করার প্রযুক্তি সরবরাহ করে।
‘ট্রেজারি বন্ড’ (রাষ্ট্রীয় ঋণপত্র) গাজা যুদ্ধে লগ্নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশ্বের বৃহত্তম ব্যাংক যেমন- ফ্রান্সের ‘বিএনপি পারিবাস’ ও ব্রিটেনের ‘বার্কলেস’ ইসরাইলকে স্বল্প সুদে ঋণ দান করছে, যা যুদ্ধ চলাকালে সুদের হার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করেছে।
দুটি মার্কিন বহুজাতিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ‘ব্ল্যাকরক’ ও ‘ভ্যানগার্ড’ সামনে থেকে বিপুল বিনিয়োগ করে চলেছে। সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকরক-এর অধীনস্ত যেসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হল- পালানটিয়ার, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, অ্যালফাবেট, আইবিএম, লকহিড মার্টিন, ক্যাটারপিলার, ভ্যানগার্ড, শেভরন, এলবিট সিস্টেমস।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ঔপনিবেশিক কর্মকাণ্ড এবং সংশ্লিষ্ট গণহত্যা ঐতিহাসিকভাবে কর্পারেট খাতের মাধ্যমে পরিচালিত ও সহায়তাপুষ্ট হয়ে আসছে।’ ইসরাইলের দখলদারিত্বকে ‘ঔপনিবেশিক বর্ণবাদী পুঁজিবাদ’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। সেখানে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো অবৈধ দখল থেকে বিপুল মুনাফা করছে।
ইসরাইলের সামরিক ব্যয় ২০২৩-২৪ সালে ৬৫ শতাংশ বেড়ে হয় ৪৬৫০ কোটি ডলার, যা বিশ্বের সর্বোচ্চ মাথাপিছু সামরিক ব্যয়ের দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। বিভিন্ন অস্ত্র, প্রযুক্তি ও পরিকাঠামো নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার-মূল্য বেড়েছে। তেল আবিব স্টক এক্সচেঞ্জ ১৭৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে এবং এদের বাজার মূল্য হয়েছে ১৫,৭৯০ কোটি ডলার।
বিমা প্রতিষ্ঠান যেমন- অ্যালিয়্যাঞ্জ এবং অ্যাক্সা ইসরাইলি শেয়ার ও বন্ডে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। আংশিকভাবে মূলধন রিজার্ভের জন্য হলেও প্রধানত তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে বিপুল মুনাফা করা।
যদিও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব রয়েছে মানবাধিকার লঙ্ঘন থেকে বিরত থাকা। সেটা সরাসরি হোক বা তাদের ব্যবসায়িক সম্পর্কের মাধ্যমে হোক। মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রের, তবে প্রতিষ্ঠানগুলোকেও মানবাধিকার রক্ষা করতে হবে। এটা বৈশ্বিক বাণিজ্যিক নীতিমালার মধ্যে পড়ে।
সাপ্লাই চেইনে কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি রয়েছে কি না, প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই তা যাচাই করতে হবে। ব্যর্থ হলে তা অপরাধমূলক দায় সৃষ্টি করতে পারে। প্রতিষ্ঠানের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিরা আন্তর্জাতিক আদালতে অভিযুক্ত হতে পারেন। তাই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আহ্বান জানানো হয়েছে, তারা যেন অবিলম্বে ইসরাইলের অবৈধ দখলদারিত্বে যুক্ত কার্যক্রম থেকে সরে আসে এবং বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে।
আলবেনিজের রিপোর্টে আরো বলা হয়, এই মর্মে আন্তর্জাতিক আদালতের রায় কার্যত ইসরাইলের জবরদখলকে ‘আগ্রাসনের কাজ’ হিসেবে অভিযুক্ত দিয়েছে। ফলে দখলদারিত্ব ও সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে সমর্থন বা তা বজায় রাখতে সহায়তা করা আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিভিন্ন রাষ্ট্রকে ইসরাইলের সঙ্গে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক বা বিনিয়োগ সম্পর্ক স্থাপন থেকে বিরত থাকতে হবে এবং এমন সম্পর্ক প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে, যা অবৈধ দখল বজায় রাখতে সাহায্য করে।





















































































































