বন্দে মাতরমের সার্ধশতবর্ষ: ভারতের সাংস্কৃতিক নবজাগরণের উদযাপন

ড. রতন ভট্টাচার্য
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জন গণ মন’ জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি পায়, আর বন্দে মাতরম জাতীয় গান। চলতি বছর ভারতবর্ষ এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হচ্ছে। এবছর দেশ উদযাপন করছে বন্দে মাতরমের সার্ধশত বর্ষপূর্তি। ১৫০ বছর আগে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচনা করেছিলেন এই অমর সংগীত, যা আজও ভারতীয়দের হৃদয়ে দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ এবং মাতৃভূমির প্রতি ভক্তির প্রতীক হয়ে আছে। বন্দে মাতরম কেবল একটি কবিতা নয়, এটি ছিল এক মহাগান, যা ধীরে ধীরে স্বাধীনতা সংগ্রামের আহ্বানে রূপান্তরিত হয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্র বন্দে মাতরম রচনা করেছিলেন সংস্কৃত ও বাংলার মিশ্রণে। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস আনন্দমঠে, যা ১৮৮২ সালে প্রকাশিত হয়, বঙ্কিম এই গানটি দিয়েছেন সন্ন্যাসী বিপ্লবীদের মুখে, যারা সংসার ত্যাগ করে মাতৃভূমির মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
উপন্যাসের কাহিনি ও গানের পংক্তি একত্রে সাহিত্য, আধ্যাত্মিকতা ও জাতীয়তাবাদের এক শক্তিশালী সংমিশ্রণ তৈরি করেছিল। ১৮৯৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বন্দে মাতরম-কে সুরারোপ করে কলকাতায় অনুষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে গানটি পরিবেশন করেন। আর গানটি মুহূর্তেই জাতীয় সংগীতের মর্যাদা পেল। সেই থেকে বন্দে মাতরম সাহিত্য জগতের সীমা ছাড়িয়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের গান হয়ে উঠল। শ্রীঅরবিন্দ, সুভ্রমানিয়া ভারতী প্রমুখ গানটিকে আরও জনপ্রিয় করে তুললেন. ফলে এটি বাংলার গণ্ডি ছাড়িয়ে সমগ্র ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ল।
স্বাধীনতার পর জাতীয় সংগীত নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। ১৯৫০ সালে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জন গণ মন’ জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি পায়, আর ‘বন্দে মাতরম’ জাতীয় গান হিসেবে সমান মর্যাদা লাভ করে। এই দ্বৈত স্বীকৃতি ভারতের সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের প্রতীক। আজ দেশজুড়ে বন্দে মাতরম-এর সার্ধশত বর্ষপূর্তি উদযাপন হচ্ছে বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে, সব মিলিয়ে এক মহোৎসব। প্রবাসী ভারতীয়রাও নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গানটির বৈশ্বিক প্রতিধ্বনি তুলে ধরছেন। বর্তমান সময়ে বন্দে মাতরম আমাদের মনে করিয়ে দেয় শিকড়ের কথা। বিশ্বায়নের যুগে এটি আমাদের ভূমির প্রতি দায়বদ্ধতার কথা বলে। নদী, পাহাড়, মাটি — সবকিছুর পবিত্রতার কথা মনে করায়। একই সঙ্গে এটি আমাদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়, যাতে আমরা ন্যায়, সমতা ও সম্প্রীতির মাধ্যমে দেশপ্রেমকে বাস্তবে রূপ দিই। বন্দে মাতরম-এর ইতিহাস আসলে ভারতের সাংস্কৃতিক নবজাগরণের ইতিহাস। বঙ্কিমচন্দ্রের এই কালজয়ী রচনা এমন সময়ে এসেছিল, যখন ভারত আধুনিকতার পথে জাগ্রত হচ্ছিল, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল, আর নিজের পরিচয় খুঁজছিল। গানটি হয়ে উঠেছিল ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সেতুবন্ধন, আধ্যাত্মিকতা ও রাজনীতির মিলন, সাহিত্য ও কর্মের সংযোগ।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় বন্দে মাতরম হয়ে উঠল প্রতিবাদের প্রাণস্পন্দন। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে মিছিলকারীরা এর স্লোগান তুললেন, ছাত্ররা বিদ্যালয়ে গাইল, বিপ্লবীরা কারাগারে বসে এর পংক্তি উচ্চারণ করলেন। ব্রিটিশ সরকার গানটির বিপুল প্রভাব দেখে বহুবার এর প্রকাশ্যে গাওয়া নিষিদ্ধ করেছিল, কিন্তু নিষেধাজ্ঞা গানটির প্রতীকী মর্যাদা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। বন্দে মাতরম গাওয়া মানে ছিল স্বাধীনতার প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করা, শাস্তির ঝুঁকি নিয়ে দেশপ্রেম প্রকাশ করা, আর বৃহত্তর জাতীয় সংগ্রামের অংশ হয়ে ওঠা। অসংখ্য বিপ্লবীর আত্মত্যাগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বন্দে মাতরম। খুদিরাম বসু ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে বন্দে মাতরম উচ্চারণ করেছিলেন। ভগৎ সিং ও তাঁর সহযোদ্ধারা কারাগারে বসে গেয়েছিলেন।
১৯৪২ সালে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে প্রতিবাদীদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল এই গান। বন্দে মাতরম হয়ে উঠেছিল প্রতিরোধের সঙ্গীত, যা কোটি কোটি মানুষের আশা আকাঙ্খা বহন করেছিল। তবে গানটি নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি।
মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, গানটিকে আক্ষরিক ধর্মীয় আহ্বান হিসেবে নয়, বরং কাব্যিক রূপক হিসেবে দেখা উচিত। তাঁর মতে, বন্দে মাতরম ছিল ভূমির প্রতি ভালবাসার প্রকাশ, কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়। এই বিতর্ক আসলে ভারতের বহুত্ববাদী পরিচয়ের প্রতিফলন। আজ বন্দে মাতরমের সার্ধশত বর্ষপূর্তি উপলক্ষে মনে রাখতে হবে বিপ্লবীদের অবদান। তাঁদের সাহস, তাঁদের আত্মত্যাগ, তাঁদের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত বন্দে মাতরম আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। গানটি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেই সংগ্রামের কথা, সেই অঙ্গীকারের কথা। বন্দে মাতরম কেবল একটি গান নয়, এটি ভারতের আত্মপরিচয়ের প্রতীক। বিপ্লবীরা এটিকে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কারণ, তাঁদের কাছে এটি ছিল মাতৃভূমির প্রতি সর্বোচ্চ ভক্তি ও আত্মত্যাগের প্রতীক। তাঁদের সংগ্রামে গানটি ছিল শক্তি, সাহস ও অনুপ্রেরণার উৎস। আজও বন্দে মাতরম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দেশপ্রেম কেবল রাজনৈতিক নয়, এটি আধ্যাত্মিকও। মাতৃভূমির প্রতি ভক্তি, আত্মত্যাগ ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বন্দে মাতরম চিরকাল স্বমহিমায় বিরাজ করবে। সার্ধশত বর্ষপূর্তিতে আমরা স্মরণ করি তাঁদের, যারা বন্দে মাতরম উচ্চারণ করে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁদের উত্তরাধিকার আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে। গানটির প্রতিটি শব্দে মাতৃভূমির প্রতি অগাধ ভালবাসা, ত্যাগ ও শ্রদ্ধা প্রকাশ পেয়েছে। স্বাধীনতার লড়াইয়ে অসংখ্য বিপ্লবী এই গানকে নিজেদের শক্তি ও সাহসের উৎস হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
আজও বন্দে মাতরম ভারতের হৃদস্পন্দন। এটি কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, বর্তমানেরও প্রেরণা। গানটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দেশপ্রেম কোনো ক্ষণস্থায়ী আবেগ নয়, বরং এটি চিরন্তন শক্তি, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়। বন্দে মাতরম আমাদের শেখায় মাতৃভূমির প্রতি শ্রদ্ধা ও আত্মত্যাগের মূল্য। এটি শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রতীক নয়, সাংস্কৃতিক ঐক্যেরও প্রতীক। ভারতের বহুত্ববাদী সমাজে এই গান মানুষকে একসূত্রে বাঁধে। বাংলার মাটি থেকে জন্ম নেওয়া এই সংগীত আজ সমগ্র ভারতের আত্মার সঙ্গে মিশে গেছে।
অতএব বলা যায়, বন্দে মাতরম আজও ভারতের আত্মার সংগীত। এটি আমাদের অতীতের সংগ্রাম, বর্তমানের ঐক্য এবং ভবিষ্যতের আশা — সবকিছুরই প্রতীক। যখনই আমরা এই গান গাই, তখনই অনুভব করি মাতৃভূমির সঙ্গে আমাদের অটুট বন্ধন। বন্দে মাতরম আজও ভারতের হৃদস্পন্দন, আত্মার সংগীত, মাতৃভূমির প্রতি চিরন্তন প্রণাম।
(লেখক: আন্তৰ্জাতিক নানা পুরস্কারজয়ী বহুভাষী কবি ও সাংবাদিক ড. রতন ভট্টাচাৰ্য ভাৰ্জিনিয়া কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়েৱ প্ৰাক্তন অধিভুক্ত অধ্যাপক এবং কলকাতাস্থ ইন্ডিয়ান আমেরিকান সোসাইটির সভাপতি)





































































































































