মেজর সত্য গুপ্ত: নেতাজীর বিপ্লবী অভিযাত্রার এক অবিস্মরণীয় সহযোদ্ধা

দৈনিক জনকণ্ঠ, অভীককুমার দে: ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের পদচিহ্ন ততটা চোখে পড়েনি, কিন্তু যাঁদের পদধ্বনি যুগ যুগ ধরেই জাতির বিবেককে জাগিয়ে রাখে, তাঁরা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না থাকলেও ইতিহাসের ভিত রচনা করেছেন নীরবে। এমনই এক দীপ্তিমান ব্যক্তিত্ব মেজর সত্য গুপ্ত। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর বিশ্বস্ত সহচর ছিলেন তিনি। বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের অন্যতম সংগঠক এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের এক নির্ভীক সৈনিক এই মানুষটি। নিজেকে পুড়িয়ে জাতির পথ আলোকিত করার এক অনন্য দৃষ্টান্ত তাঁর জীবন।মেজর সত্য গুপ্ত-এর পূর্ণনাম সত্যভূষণ গুপ্ত। ১৯০২ সালের ১৮ জুলাই। তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার নোয়াখালি জেলার ফেনী মহকুমার বেজগাঁও গ্রামে এক সচ্ছল ব্রাহ্ম পরিবারে জন্ম। তাঁদের আদি নিবাস বিক্রমপুরে। পিতা প্যারীমোহন গুপ্ত ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের পুলিশ বিভাগের একজন কর্মকর্তা এবং মাতা সুভাষিনী দেবী ধর্মপ্রাণ ও শিক্ষানুরাগী গৃহিণী। এগারো সন্তানের মধ্যে সত্য গুপ্ত ছিলেন তৃতীয় পুত্র। পারিবারিক পরিবেশে শৃঙ্খলা, শিক্ষানুরাগ, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধের যে চর্চা ছিল, তা তাঁর চরিত্র গঠনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। কৈশোরেই তিনি শান্তিনিকেতনে কিছু সময় অতিবাহিত করেন এবং সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর সংস্পর্শে আসার সুযোগ লাভ করেন। পরবর্তীকালে অশ্বিনীকুমার দত্ত এবং হেমচন্দ্র ঘোষ-এর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের পথে আত্মনিয়োগ করেন। ফলস্বরূপ, অসহযোগ আন্দোলনের আহ্বানে সাড়া দেন। পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করলেও, তাঁর প্রকৃত শিক্ষালয় হয়ে উঠেছিল দেশের মুক্তি-সংগ্রাম। হেমচন্দ্র ঘোষের বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি আত্মনিবেদিত বিপ্লবী জীবনকেই বেছে নেন।
১৯২৭ সাল। কলকাতায় এসে জীবনের মোড় ঘুরে যায় তাঁর। এখানেই সুভাষচন্দ্র বসু ও শরৎচন্দ্র বসুর সঙ্গে দেখা হয়। দুই মহান দেশনায়কের সাহচর্যে সত্য গুপ্ত উপলব্ধি করেন, প্রতিবাদের পাশাপাশি সুসংগঠিত জাতীয় শক্তিরও প্রয়োজন আছে। ১৯২৮ সালে, কলকাতা কংগ্রেস অধিবেশনে সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে যে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে ওঠে, তা পরবর্তীকালে “বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স” নামে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। সেই বাহিনীর ‘মেজর’ হিসেবে নিযুক্ত হন সত্য গুপ্ত। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দেন। সেই থেকেই তিনি মেজর সত্য গুপ্ত নামে পরিচিতি লাভ করেন।
বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স মূলত স্বাধীনতার জন্য আত্মবলিদানে প্রস্তুত একদল তরুণের অগ্নি-শপথ। বিনয়, বাদল, দীনেশের মতো বিপ্লবীদের উত্থানের পেছনে এই সংগঠনের অনুপ্রেরণা ছিল সীমাতীত। মেজর সত্য গুপ্ত-ই তাঁদের মধ্যে শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম এবং আত্মত্যাগের চেতনা সঞ্চার করেছিলেন।১৯৩০ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে। রাইটার্স বিল্ডিং আক্রমণের পর দীর্ঘ সময় তিনি আলিপুর, বক্সা, হিজলি, মিনওয়ালি ও ইয়েরওয়াডা কারাগারে রাজবন্দি হিসেবে বন্দিজীবন কাটিয়েছেন। কিন্তু, কারাগারের প্রাচীর তাঁর আদর্শকে বন্দি করতে পারেনি। বন্দিশালার অন্ধকারেই তাঁর দেশপ্রেম আরও দীপ্ত হয়ে ওঠে। মুক্তি লাভের পর, পুনরায় নেতাজীর সংগঠনে আত্মনিয়োগ করেন এবং তাঁর অন্যতম বিশ্বস্ত সহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৪১ সালে নেতাজীর ঐতিহাসিক মহানিষ্ক্রমণের পর, ব্রিটিশ সরকার আবারও তাঁকে বন্দি করে রাখে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত।নেতাজীর প্রতি তাঁর আনুগত্য এতটাই নিঃস্বার্থ আর নির্ভেজাল ছিল যে, রাজনৈতিক মতাদর্শের সীমা অতিক্রম করে নেতাজীকে তিনি জাতীয় মুক্তির এক অমর প্রতীক হিসেবে দেখতেন। জীবনের অন্তিম দিন পর্যন্ত নেতাজীর আদর্শ প্রচার করেছেন মেজর সত্য গুপ্ত। নেতাজীর স্বপ্নের ভারত গড়ে তোলাই মনে করতেন স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ এবং নিজেকে সমর্পণও করেছিলেন সেই ভাবনা থেকেই।স্বাধীনতার পর মেজর সত্য গুপ্ত ক্ষমতা বা প্রতিষ্ঠার মোহে কখনোই আকৃষ্ট হননি। তিনি উত্তর ২৪ পরগনার বাগু গ্রামে সমাজসেবা, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর কাছে, দেশসেবার মানে যেমন বিদেশি শাসকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম; তেমনই স্বাধীন দেশের মানুষের জীবনমান উন্নত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ ও কর্তব্য। এই আদর্শ তাঁকে প্রকৃতই জননায়কের মর্যাদা দিয়েছে।১৯৬৬ সালের ১৯ জানুয়ারি তাঁর জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু আদর্শের মৃত্যু হয়নি। ইতিহাস আজও তাঁর নাম উচ্চারণে কুণ্ঠিত হলেও দেশপ্রেমের ইতিহাসে তিনি চিরস্মরণীয়। নেতাজীর সংগ্রামী জীবনের যে অধ্যায় সাহস, শৃঙ্খলা ও আত্মত্যাগের জন্য উজ্জ্বল, সেই অধ্যায়ের অন্যতম নির্মাতা ছিলেন মেজর সত্য গুপ্ত। ভারতের স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করতে হলে, মেজর সত্য গুপ্তের জীবন, চরিত্র ও আত্মত্যাগের ইতিহাস নিয়ে ভাবতেই হবে। দেশকে যে কতটা ভালবাসা যায়, তার বিরলতম উদাহরণ মেজর সত্য গুপ্ত।




















































































































