তিলোত্তমা, আপনিও ঝাঁকের কই?

মতিয়ূর রহমান
সম্প্রতি লেখিকা তিলোত্তমা মজুমদার এক বেসরকারি টিভি নিউজ চ্যানেলের অনুষ্ঠানে এ দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষদের সম্পর্কে যে চরম বিদ্বেষ এবং ঘৃণামূলক বক্তব্য রেখেছেন, তা নিয়ে সামাজিক মাধ্যম এখন খুবই সরগরম এবং আন্দোলিত। প্রসঙ্গত, তিলোত্তমার উত্থানকালের লেখাগুলোতে তাঁকে যেভাবে পেয়েছি, তাতে লেখা এবং ব্যক্তিমানুষ হিসেবে তাঁর প্রতি একটা সম্ভ্রমের জায়গা তৈরি হয়েছিল।
আমার শহর বারুইপুরের এক সাহিত্যসভায় তাঁর সাথে ব্যক্তিগত পরিসরেও কিছু কথাবার্তা হয়েছিল। তখন মানুষ এবং লেখিকা হিসেবে তিনি যে শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন, আজ তাঁর খোলাখুলি বিদ্বেষ এবং উদ্দেশ্যমূলক ঘৃণার এই বক্তব্য তাঁকে সেই আসন থেকে একেবারে নিচে নামিয়ে আনল।
লেখক-লেখিকা তো বটেই, একজন শিক্ষিত এবং সাধারণ মানুষের বীক্ষণ হবে ইতোরশ্রেণির বীক্ষণের থেকে পুরো আলাদা, তাদের সমপর্যায়ের নয়। তিলোত্তমার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বল্গাহীন হঠকারী ভাষণে যে বীক্ষণ ফুটে উঠেছে, তা তাঁর কাছে আশা করিনি।
তিলোত্তমা ধর্ম ও ধর্ম নামের বাহ্যিক পরিচয়ের আপামর সকল মানুষকে একটিমাত্র বন্ধনীতে আবদ্ধ করলেন। কোটি কোটি নিরীহ ভালমানুষ তাতে ক্ষতবিক্ষত হল, রক্তাক্ত হল। এককথায় এভাবেই সে বন্ধনী যদি রচনা করা যায়, তাহলে এই দেশ এবং এই দেশের বাইরের বহু ধর্মকে সেই একই আঘাত হানা যায়। নাম পরিচয়ে শুধু মুসলমান কেন, আরো অনেককেই ওইরকম বন্ধনীভুক্ত করাও যায়। প্রতিটি জিনিসের তর-তম থাকে এবং আছেও।
আধুনিক কালের বিচারে ইসলামী মৌলবাদ ও জিহাদ ইত্যাদি ন্যারেটিভের মধ্যে যে জঘন্য অমানবিক রূপ আছে, তার সাথে যুক্ত কত শতাংশ মুসলমান? সেই সংখ্যাটা কি সঠিকভাবে তিলোত্তমার জানা আছে? একটা বিক্ষিপ্ত অংশ বা কিছু অংশ যুক্ত হলেই যদি এমনভাবে বলা যায়, তাহলে তো অন্যদের সম্পর্কেও একই কথা অনায়াসে প্রযোজ্য।
পাঠিক-পাঠিকা, ভাববেন না যেন, ইসলাম ও মুসলমান আক্রান্ত বলেই এই লেখা। না, মোটেই তা নয়। এই লেখা সত্য ও ন্যায়ের জন্য প্রতিবাদ। এর আগে অন্যান্য বহুক্ষেত্রেই আমি সাধ্যমত এমন অমানবিকতার বিরুদ্ধে মুখ খুলেছি। এই বিষয় যখন মিডিয়ায় এসেছে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে, তখন খোলাখুলিভাবে কিছু সংগত ও যৌক্তিক কথা বলা উচিত, মুখে কুলুপ এঁটে থাকা বা সাতে পাঁচে না থাকা, একজন সমাজ সচেতন নাগরিকের জন্য শোভনীয় বা কাম্য নয়।
অনস্বীকার্য যে, তিলোত্তমার কথার মধ্যে অসঙ্গতি আছে, অসংলগ্নতা আছে, আছে সামগ্রিক ঘৃণা। এভাবে কোটি কোটি মানুষকে একই বন্ধনীভুক্ত না করে এসব কথা তিনি অন্যভাবেও বলতে পারতেন। পশাপাশি মুসলমানদেরও আত্মসমালোচনা করা উচিত যে, এমন কথা তাদের প্রতিবেশিনী কেন বলছেন! এটা মুসলমানদের জন্য বর্তমানে খুবই জরুরী হয়ে পড়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম প্রসঙ্গে বলতে হয়, মানুষ যেদিন ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম এবং আলাদা আলাদা ঈশ্বর ও দেব দেবতাকে খুঁজে বার করতে সফল হয়েছে, সেই দিন থেকেই মানবজমিনে প্রোথিত হয়েছে বিষবৃক্ষের বীজ। আজ সেই বিদ্বেষবৃক্ষ ফুলে-ফলে মহীরূহ হয়ে উঠেছে। আজ নৈতিকতার চরম সংকট, মানবতার লেশমাত্র দেখা যাচ্ছে না, মনুষ্যত্বের মন্বন্তর চলছে, মূল্যবোধের অবক্ষয় গভীর হয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের অন্যতম হাতিয়ার হয়েছে ধর্ম। তাই আপন ঘোলের সবটা মিষ্টি, আর অপরের ঘোল সবটাই দুর্গন্ধময় পচা। মোদ্দাকথা হল- “মারি অরি, পারি যে কৌশলে” ছিঃ, ছিঃ, ছিঃ…”!
অনুপ্রবেশ অবৈধ, সেই নিরিখে অনুপ্রবেশ অবশ্যই অপরাধ বা সিরিয়াস ক্রাইম। কিন্তু অনুপ্রবেশ হয় কীভাবে? আর যদি হয়ও, তাহলে এই ক্রাইম কন্ট্রোলের দায় কার? দায় কেন্দ্র এবং রাজ্য উভয় সরকারেরই। যার যার ক্ষমতার জুরিডিকশন অনুযায়ী। দেশের মানুষ সে ক্ষমতা সরকারকে দেয়। কোটি কোটি মানুষ যদি অনুপ্রবেশ করেই থাকে, তাহলে অপদার্থ সরকার যে দেশ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে, তা প্রমাণিত।
তিলোত্তমা মজুমদার সে বিষয়ে কথা না বলে খুল্লমখুল্লা সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিলেন কার স্বার্থে এবং কার দালালি করতে? অবাক কাণ্ড, এ তো দু-আড়াই দশক আগের আমার চেনা সেই মুক্তচিন্তার তিলোত্তমা নন। এ তো ভিন্ন জন, ভিন্ন মানুষ। কবে বদলালেন তিলোত্তমা? তিলোত্তমা, লেখক লেখিকার কাছে মানুষ সত্য, ন্যায়, মনুষ্যত্ব ও মুক্ত চিন্তা আশা করে। আপনি পতিত হলেন আপনার আসন থেকে।
সরকারকে বলুন, অনুপ্রবেশ রুখতে এবং সংবিধান অনুযায়ী রাজধর্ম পালন করতে। তাহলেই সমস্যার সমাধান হবে। বেচাল দেখলেই ব্যাঁকা মুসলমান ও ট্যারা হিন্দু সবাইকে সোজা করতে হবে। তা হলেই সব সুরাহা হবে। কেবল ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ধর্মের সুড়সুড়ি দিয়ে মানুষ ও আধা মানুষদেরকে পুরো জানোয়ার করে দিলে আশু পরিণামে কারো লাভ হলেও হতে পারে, তবে দেশের জন্য তা হিতকর হবে না। আপনি একজন সাহিত্যিক হয়ে কেন এই ফাঁদে পা দেবেন!
আর একটি বড় বিষয় হল, এসআইআর বা এনআরসি হোক সঠিক পথে। আমি এবং আমার মতো অগণিত মানুষ তা চায়। তাহলে সত্যিসত্যিই দেখা যাবে মুসলমান এবং হিন্দু অনুপ্রবেশকারীর অনুপাতটা কী। অনুপ্রবেশকারীর একটা নির্দিষ্ট সংজ্ঞা আছে। তাতে যারা পড়ে, তাদেরকে আইনের আওতায় এনে যথাযথ ব্যবস্থা নিলে তো আপনার মনোরঞ্জনী গল্পটি আর করতে হয় না কষ্ট করে।
এর জন্য সারা দুনিয়ার খবরে কী কাজ? আর হ্যাঁ, যদি “ইসলাম, মুসলমান ও সন্ত্রাস” শীর্ষক কোন আলোচনার ডাক পান, তাহলে এসব কথা বলুন। যেখানে যেখানে পাশে থাকার, ঠিক পাশে থাকব। যদিও আপনার কথা মোতাবেক বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে ঘৃণিত নাম হল তালিবান। তাদের সাথে এখন তো আমাদের দেশের ক্ষমতাবানদের গভীর সখ্য। তিলোত্তমা, এ বিষয়ে আপনার সুচিন্তিত মতামত কী? আপনি কি ওই জোব্বাওয়ালাদের ভয় পেয়েছেন? ওরা আবার আপনার মতো মহিলা সাহিত্যিক, সাংবাদিককে যে চোখে দেখে, তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। আপনার জন্য করুণা হচ্ছে। বারবার মনে হচ্ছে বারুইপুরের সেই মুক্তচিন্তার আলোচনার কথা। আপনি সত্যিই পতিত হলেন। জানি না, আপনি জ্ঞাতসারে নাকি অজ্ঞাতে এই পাঁকে পড়লেন!

























































































































