অমুসলিমদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় বিশ্বনবী (সা.)

এস. ইসলাম
মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কেবল মুসলমানদের জন্য নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন। তিনি আল্লাহর কাছ থেকে যে শিক্ষা লাভ করেছিলেন, তা কেবল একটি ধর্মীয় জীবনপদ্ধতি নয়; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ মানবিক সভ্যতার দিকনির্দেশনা। মানবতার বন্ধু হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এমন এক সময়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন, যখন আরব উপদ্বীপ গোত্রবাদ, ভেদাভেদ, নিপীড়ন এবং জুলুমে জর্জরিত ছিল। দুর্বল ও সংখ্যালঘু মানুষ, বিশেষ করে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা ছিল চরম অনিরাপদ। এমন বাস্তবতায় তিনি যে আদর্শ সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাতে ভিন ধর্মের মানুষরা প্রথম বারের মতো অধিকার ও মর্যাদার নিশ্চয়তা লাভ করে।
নবী (সা.)-এর শিক্ষা কুরআনের আলোকে গড়ে উঠেছিল। কুরআনে আল্লাহ তা’আলা ঘোষণা করেন: “ধর্মের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই।” (সূরা বাকারা: ২৫৬)। “তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম, আর আমার জন্য আমার ধর্ম।” (সূরা কাফিরুন: ০৬)। “হে মানবজাতি! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পারো। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।” (সূরা হুজুরাত: ১৩)। এসব আয়াত দেখায়, ইসলাম কোনো জাতি, গোত্র বা ধর্মের প্রতি বিদ্বেষের শিক্ষা দেয় না; বরং মানবিক মর্যাদাকে সবার উপরে স্থান দিয়েছে ইসলাম। নবী করিম (সা.) এই শিক্ষাকে সমাজে বাস্তবায়ন করেছেন।
মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর মুসলমান, ইহুদি ও অন্যান্য গোত্রকে নিয়ে একটি লিখিত চুক্তি করেন। এটি ইতিহাসে প্রথম সংবিধান হিসেবে পরিচিত। ‘মদিনা সনদ’ নামে খ্যাত এই দলিলে বলা হয়েছিল, প্রত্যেক সম্প্রদায় তাদের ধর্ম পালনে স্বাধীন থাকবে। সবাই সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করবে। কোনো গোষ্ঠী আক্রমণের শিকার হলে অন্যরা তাকে সহযোগিতা করবে। কারো জান-মাল ও সম্মানের উপর আঘাত করা যাবে না। এটি ছিল এক অনন্য উদাহরণ, যেখানে বহু ধর্ম ও বহু গোত্র এক রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে মর্যাদা ও নিরাপত্তা লাভ করেছিল।
নবী করিম (সা.) কখনো কাউকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেননি। তিনি মক্কায় থাকাকালীন নির্যাতন সহ্য করেছেন, তবুও কারো ওপর প্রতিশোধ নেননি। মদিনায় রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভ করার পরও তিনি ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের নিজ নিজ ধর্ম পালনে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেন। কুরআনে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে: “যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন, তবে সবাইকে একই উম্মত বানাতেন। কিন্তু তিনি চেয়েছেন তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে। সুতরাং তোমরা ভাল কাজে প্রতিযোগিতা করো।” (সূরা আল মায়েদা: ৪৮)। এই আয়াতের আলোকে নবী (সা.) অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সহনশীলতা ও সম্মানের শিক্ষা দেন।
প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি কোনো অমুসলিম নাগরিক (জিম্মি)-কে কষ্ট দেয়, তার অধিকার হরণ করে বা তার ক্ষতি সাধন করে, আমি কেয়ামতের দিন তার বিরুদ্ধে দাঁড়াব।” (আবু দাউদ, নাসায়ী)। এ ছিল এক যুগান্তকারী ঘোষণা। তখনকার সমাজে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা নিপীড়িত ছিল। অথচ নবী (সা.) তাদের সুরক্ষার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিলেন এবং অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে বিচার দিবসে সাক্ষ্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন।
নবী (সা.) ইন্তেকালের সময় তাঁর বর্ম এক ইহুদির কাছে জামানত রাখা ছিল। এটি প্রমাণ করে, তিনি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর সঙ্গে আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। অনেক ইহুদি নারী-পুরুষ তাঁর কাছে ন্যায়বিচারের আশায় আসত এবং তিনি তাদের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে সমাধান করতেন। প্রতিবেশী অমুসলিম হলেও নবী (সা.) তাদের সঙ্গে সদাচরণ করতেন। হাদিসে তিনি বারবার প্রতিবেশীর হক আদায়ের ব্যাপারে জোরালো নির্দেশ দিয়েছেন।
নবী (সা.) যুদ্ধের সময় কঠোর নিয়ম দিয়েছিলেন, যেমন- নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও ধর্মীয় পণ্ডিতদের ক্ষতি না করা। উপাসনালয় ধ্বংস না করা। অযোদ্ধাদের হত্যা না করা। এটি দেখায় যে, ইসলামের সমরনীতি কেবল প্রতিরক্ষা ও ন্যায়ের জন্য, কোনো ধর্মীয় নিপীড়নের জন্য নয়।
বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে নবী (সা.) বলেন: “হে মানুষ! তোমাদের প্রভু একজন, তোমাদের পিতা একজন। একজন আরবের উপর অনারবের, আর অনারবের উপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্বেতাঙ্গের উপর কৃষ্ণাঙ্গের, কিংবা কৃষ্ণাঙ্গের উপর শ্বেতাঙ্গেরও কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তাকওয়ায়।” এই ঘোষণা মানবিক মর্যাদার এমন এক চিরন্তন দলিল, যা জাতপাত, বর্ণ, গোত্র ও ধর্মের সব বিভাজনকে অস্বীকার করেছে।
আজকের বিশ্বে মানবাধিকারের যে সনদ ১৯৪৮ সালে প্রণীত হয়েছে, তা মূলত ১৪০০ বছর আগে নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রদত্ত নীতির প্রতিধ্বনি। ভিন্ন ধর্মের মানুষদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর শিক্ষা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
মহামানব মুহাম্মাদ (সা.) ছিলেন সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমত। তিনি শুধু মুসলমানদের জন্য নয়; ইহুদি, খ্রিষ্টান, মজুসি, এমনকি অবিশ্বাসীদের প্রতিও ন্যায়বিচার ও মানবিক আচরণের শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি ধর্মীয় স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার, পারস্পরিক সহযোগিতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ভিত্তিতে একটি আদর্শ ও সুসংহত সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর জীবন ও শিক্ষা প্রমাণ করে, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা মুসলমানদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারে এবং তাদের অধিকার ও মর্যাদা ইসলামে সর্বদা সুরক্ষিত। তাই বলা যায়, শেষ পয়গম্বর মুহাম্মাদ (সা.) কেবল ধর্মীয় নেতা নন; বরং মানবাধিকারের সর্বজনীন রক্ষক। তাঁর দেখানো পথ অনুসরণ করলেই পৃথিবীতে শান্তি, সম্প্রীতি, ন্যায় প্রতিষ্ঠা হওয়া সম্ভব।



























































































































