লাঠির ঘায়ে কি আস্থা ফেরে? নিট বিতর্ক: গণতন্ত্রের কঠিন পরীক্ষা

একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মিত হয় তার শ্রেণিকক্ষে। তাই যখন জাতীয় স্তরের পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন সেটি আর কেবল প্রশাসনিক ত্রুটি থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে জাতির নৈতিকতা, শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির কঠিন পরীক্ষা।ডাক্তারির প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট-কে ঘিরে প্রশ্নপত্র ফাঁস, ফলাফল নিয়ে বিতর্ক, পরীক্ষা পরিচালনায় অনিয়মের অভিযোগ এবং দীর্ঘ অনিশ্চয়তা লক্ষ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকের মনে গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বছরের পর বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের পর একজন পরীক্ষার্থী শুধু একটি ফলাফল চায় না; সে চায় একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং বিশ্বাসযোগ্য মূল্যায়ন। সেই বিশ্বাসে যখন চিড় ধরে, তখন আহত হয় শুধু একজন ছাত্র নয়; আহত হয় সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা।
এই ক্ষোভ থেকেই দিল্লির যন্তরমন্তরে ছাত্র-ছাত্রী ও যুবসমাজের প্রতিবাদ গড়ে ওঠে। তাদের দাবির কেন্দ্রবিন্দু ছিল — পরীক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, দুর্নীতির নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে এমন অনিয়ম রোধে কার্যকর সংস্কার। কিন্তু সেই আন্দোলনের মাঝেই পুলিশের বলপ্রয়োগ, লাঠিচার্জ এবং কাঁদানে গ্যাস প্রয়োগের অভিযোগ নতুন করে দেশবাসীকে ভাবিয়ে তোলে।প্রশ্ন ওঠে, যে কণ্ঠ ন্যায়বিচার চাইছে, তার উত্তর কি লাঠির ভাষায় দেওয়া উচিত? এই আন্দোলনের পেছনে ছিল আরও এক বেদনাদায়ক বাস্তবতা। নিট-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা, প্রবল প্রতিযোগিতা এবং মানসিক চাপের আবহে একাধিক পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর দেশকে নাড়া দিয়েছে। প্রতিটি এমন মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়; এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সংবেদনশীলতার সীমাবদ্ধতারও নির্মম স্মারক। কোনো পরীক্ষাই একটি তরুণ প্রাণের চেয়ে মূল্যবান হতে পারে না।
দিল্লির যন্তরমন্তর বহু দশক ধরে ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের প্রতীক। সেখানে নাগরিকেরা নিজেদের দাবি শান্তিপূর্ণভাবে তুলে ধরেন। তাই সেই ঐতিহাসিক স্থানেই যদি প্রতিবাদের ভাষা সংলাপ থেকে সংঘর্ষে রূপ নেয়, তবে প্রশ্ন উঠবেই — আমরা কি মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকারকে যথেষ্ট মর্যাদা দিতে পারছি? অবশ্যই আইন শৃঙ্খলা রক্ষা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নাগরিকের অধিকার, মানবিক সংযম এবং ন্যূনতম সহনশীলতার প্রতিও সমান গুরুত্ব দিতে হয়। শক্তি প্রয়োগ কোনো কোনো পরিস্থিতিতে অনিবার্য হতে পারে, কিন্তু তা কখনোই গণতান্ত্রিক সংলাপের বিকল্প হতে পারে না।
একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদেরও মনে রাখতে হবে, শান্তিপূর্ণ ও অহিংস প্রতিবাদই গণতন্ত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা। যুক্তির শক্তি, শৃঙ্খলা এবং নৈতিক অবস্থানই একটি আন্দোলনকে ইতিহাসে মর্যাদার আসন দেয়। সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা কোনো ন্যায্য দাবিকেই শক্তিশালী করে না।আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক দোষারোপ নয়; প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি মানুষের ভেঙে পড়া আস্থার পুনর্নির্মাণ। পরীক্ষা পরিচালনা থেকে মূল্যায়ন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় কার্যকর সহায়তা ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।
কারণ, শিক্ষা কেবল চাকরি পাওয়ার সিঁড়ি নয়; শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড এবং বিবেক নির্মাণের ভিত্তি। যদি সেই ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে ভবিষ্যতের সমাজও অনিশ্চয়তার ওপর দাঁড়াবে।আজ দেশের সামনে প্রশ্ন একটাই — আমরা কি এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারব, যেখানে একজন ছাত্র পরীক্ষার হলে প্রবেশ করবে আত্মবিশ্বাস নিয়ে, আর ফলাফল প্রকাশের পর মাথা উঁচু করে বলতে পারবে, আমার প্রাপ্য আমি পেয়েছি।একটি সভ্য রাষ্ট্রের শক্তি তার লাঠিতে নয়; তার ন্যায়বোধে। একটি শিক্ষাব্যবস্থার মর্যাদা তার পরীক্ষায় নয়; সেই পরীক্ষার প্রতি মানুষের বিশ্বাসে। আর একটি গণতন্ত্রের প্রকৃত পরিচয় বিরোধিতাকে দমন করার ক্ষমতায় নয়; তাকে শোনার সাহসে।লাঠি সাময়িকভাবে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পারে; কিন্তু আস্থা, ন্যায় এবং সত্যকে কখনও পরাজিত করতে পারে না। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদেরই মনে রাখে, যারা প্রশ্নকে ভয় পায়নি, আর ক্ষমতায় থেকেও সংলাপের পথ বেছে নিয়েছিল।







































































































