সীমানার মাইন থেকে গ্লাসগোর সোনা, সেনানায়ক সোমন রানার অদম্য রূপকথা

মুহাম্মদ শাহবাজ: দেশের সীমানা পাহারা দিতে গিয়ে নিজের একটি পা হারিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু হারাননি বুকভরা সাহস আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি। প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজের ভাগ্য নিজে লেখার নামই সোমন রানা। ২০২৬ সালের গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে প্যারা অ্যাথলেটিক্সের পুরুষদের শট পুট (এফ ৫৭) বিভাগে ১৩.৪০ মিটার থ্রো করে সোনা জিতে এক নতুন ইতিহাস গড়েছেন ভারতের এই বীর সন্তান। এই ইভেন্টে ভারত কেবল সোনাই জেতেনি, শুভম জুয়ালের ১৩.২৮ মিটার থ্রো-এর সৌজন্যে এক ঐতিহাসিক রূপো জয় নিশ্চিত করে ‘ওয়ান-টু’ ফিনিশের গৌরব অর্জন করেছে। কমনওয়েলথের ইতিহাসে এই ইভেন্টে ভারতের প্রথম পদক জয় তো বটেই, তবে এর পেছনের লড়াইয়ের গল্পটি পদকের রঙের চেয়েও অনেক বেশি উজ্জ্বল।
সোমন রানার শুরুটা হয়েছিল রিংসের ভেতরে, একজন প্রতিভাবান অপেশাদার বক্সার হিসেবে। ২০০৫ সালের ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি পঞ্চম স্থানে শেষ করেছিলেন। তবে তাঁর জীবনের গতিপথ চিরতরে বদলে যায় ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ২৮ গোর্খা রাইফেলসের হাবিলদার হিসেবে জম্মু ও কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখায় দায়িত্ব পালন করার সময় একটি মর্মান্তিক ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে নিজের ডান পা হারান সোমন। এক মুহূর্তে সবকিছু বদলে গেলেও সেনা জওয়ানের ভেতরের অদম্য তেজ নিভে যায়নি। পুণের কৃত্রিম অঙ্গ কেন্দ্র অর্থাৎ ‘আর্টিফিশিয়াল লিম্ব সেন্টার’-এ যখন তাঁর রিহ্যাব চলছিল, ঠিক তখনই প্যারা অ্যাথলেটিক্সের সাথে তাঁর পরিচয় ঘটে এবং তিনি জীবনের নতুন লক্ষ্য খুঁজে পান।
প্রাথমিক দিনগুলো সহজ ছিল না। কৃত্রিম পা নিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরাই যেখানে চ্যালেঞ্জিং, সেখানে ক্রীড়াজগতে ফেরা ছিল কল্পনাতীত। কিন্তু অন্য প্যারা অ্যাথলিটদের লড়াই ও সংগ্রাম দেখে তিনি নতুন করে শক্তি ও অনুপ্রেরণা পান। নিজের মনের জোরকে পুঁজি করে ২০১৭ সালে তিনি যোগ দেন ‘আর্মি প্যারাঅলিম্পিক নোড’-এ এবং পুরোদমে শুরু করেন শট পুটের নিয়মানুগ প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণ চলাকালীন তাঁর মনোযোগ ও কঠোর পরিশ্রম দ্রুতই তাঁকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিয়ে আসে।
এর পর থেকে সোমন রানাকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০২০ টোকিও এবং ২০২৪ প্যারিস প্যারাঅলিম্পিকে ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন বিহারের গয়ার এই কৃতি সন্তান। ২০২২ সালের এশিয়ান প্যারা গেমসে রুপো এবং ২০২৫ সালের বিশ্ব প্যারা অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ পদক জিতে তিনি ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক স্তরে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন। আর ২০২৬ সালের গ্লাসগোতে সেই সাফল্যের মুকুটে যুক্ত হলো সবচাইতে মূল্যবান সোনার পালকটি। বেঙ্গালুরুর স্পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়া কেন্দ্রে কোচ রাকেশ প্রসাদের অধীনে কঠোর প্রস্তুতিই সোমনকে সাফল্যের এই অনন্য শিখরে পৌঁছে দিয়েছে।
ইতিহাস গড়ার পর নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে সোমন রানা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি জানান, পা হারানোর পর সবকিছু বদলে গেলেও যে ভালোবাসা ও সমর্থন তিনি পেয়েছেন, সেটাই তাঁর মূল শক্তি। তিনি এই ঐতিহাসিক সোনার পদক ও সাফল্যকে উৎসর্গ করেছেন নিজের পরিবার, ভারতীয় সেনাবাহিনী, কোচ রাকেশ প্রসাদ, প্যারালিম্পিক কমিটি অব ইন্ডিয়া এবং স্পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়াকে। সীমানার ল্যান্ডমাইন যার অদম্য স্পৃহাকে ধ্বংস করতে পারেনি, সেই সোমন রানা আজ কোটি কোটি মানুষের কাছে আত্মবিশ্বাস আর ঘুরে দাঁড়ানোর এক জীবন্ত প্রতীক।







































































































