নির্বাচনী ব্যবস্থার উপর গণতন্ত্রের প্রভাব

নতুন পয়গাম, মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব: যেকোন সাংবিধানিক গণতন্ত্রে সামাজিক অবিচার, সংখ্যাগরিষ্ঠতার বাড়াবাড়ি এবং রাষ্ট্রীয় স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে নাগরিকদের শেষ আশ্রয়স্থল হল বিচারব্যবস্থা। সাংবিধানিক নৈতিকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসনের নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত ভারত এই দায়িত্ব মূলত বিচার বিভাগের ওপর, বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করেছে। কিন্তু সমসাময়িক ভারতে ক্রমেই এমন একটি ধারণা গড়ে উঠছে যে, বিচারব্যবস্থা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার প্রতি ক্রমশ উদাসীন হয়ে পড়ছে। বাবরি মসজিদ সংক্রান্ত রায়, যা এক ঐতিহাসিক মোড় বদলের ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়, কেবল একটি আইনি নিষ্পত্তির প্রতীক নয়; বরং তা এক গভীর নৈতিক ও সাংবিধানিক দ্বন্দ্বের প্রতিফলন। বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতার এই উপলব্ধ ক্ষয় সামাজিক আস্থা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে।
নৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিচারব্যবস্থা:
বিচার বিভাগ কেবল আইনের ব্যাখ্যাকারী নয়; এটি একটি নৈতিক প্রতিষ্ঠানও, যার ওপর সাংবিধানিক মূল্যবোধ রক্ষার গুরুদায়িত্ব ন্যস্ত। নাগরিকরা যখন বৈষম্য, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, জাতিভিত্তিক নিপীড়ন কিংবা রাষ্ট্রীয় অতিরিক্ত ক্ষমতার শিকার হন, তখন তাঁদের ভরসা থাকে আদালতের ন্যায়বিচারের ওপর। কিন্তু যখন রায়ে সংবিধানিক নীতির পরিবর্তে রাজনৈতিক সুবিধা, সামাজিক গরিষ্ঠতার মনোভাব কিংবা তথাকথিত সমন্বয়-কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় বলে মনে হয়, তখন জনসাধারণের আস্থা ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে।
বিপদ শুধু অন্যায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; প্রকৃত বিপদ তখনই তৈরি হয়, যখন আইনি বৈধতার মাধ্যমে অন্যায়কে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য করে তোলা হয়। একবার মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করলে যে, আদালত নিরপেক্ষ ন্যায়বিচার দিতে অক্ষম বা অনিচ্ছুক, তখন তারা আইনসম্মত প্রতিবাদের পথ থেকেও সরে যেতে শুরু করে।
বাবরি রায়; এক প্রতীকী ভাঙন:
বাবরি মসজিদ ইস্যু নিছক একটি সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধের বিষয় নয়; এটি দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা, সংখ্যালঘু অধিকার এবং আইনের শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র। মসজিদ ধ্বংস একটি ফৌজদারি অপরাধ, এ কথা বিচার বিভাগ নিজেই স্বীকার করেছে। তবুও চূড়ান্ত রায়ে বিতর্কিত জমিতে মন্দির নির্মাণের অনুমতি দেওয়াকে অনেকেই সমঝোতার নামে একটি বেআইনি কাজকে বৈধতা দেওয়া হিসেবে দেখেছেন।
এই রায়ের ফলে গভীর মানসিক প্রভাব সৃষ্টি হয় — আইনের শাসন যেন ধর্মীয় বিশ্বাস ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অধীনস্থ হয়ে পড়েছে বলে মনে হয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সাংবিধানিকভাবে পরিত্যক্ত বোধ করেছে। ন্যায়বিচারকে প্রদানের বদলে দর কষাকষির ফল হিসেবে দেখা হয়েছে। এমনকি যারা এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন, তাঁদের মধ্যেও এক অস্বস্তিকর বার্তা রয়ে গেছে, ঐতিহাসিক অন্যায় আইনসম্মত প্রক্রিয়ার বদলে গণসমাবেশ ও শক্তির রাজনীতির মাধ্যমেও সংশোধিত হতে পারে।
নির্বাচিত ন্যায়বিচার ও বিচারিক উদাসীনতা:
বাবরি মামলার বাইরেও সমসাময়িক ভারতে একটি নির্দিষ্ট প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মামলায় ন্যায়বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী অভিযুক্তদের প্রতি নমনীয়তা। ভিন্নমতাবলম্বী, সমাজকর্মী ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ। দোষী সাব্যস্ত না হয়েও দীর্ঘকাল কারাবাস।
ন্যায়বিচার বিলম্বিত হলে তা অস্বীকৃত ন্যায়ে পরিণত হয়; কিন্তু ন্যায়বিচার যদি নির্বাচিতভাবে প্রদান করা হয়, তবে তা ন্যায়বিচারের ভিত্তিকেই সমূলে ধ্বংস করে দেয়। আদালত যখন বৈষম্যের প্রতি উদাসীন বলে মনে হয়, তখন নাগরিকরা বিচার বিভাগকে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী নয়; বরং ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর সম্প্রসারণ হিসেবে দেখতে শুরু করে।
বিচারব্যবস্থার প্রতি অনাস্থার পরিণতি:
বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা হারানোর ফলে সমাজে গুরুতর প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। যেমন- নৈরাশ্যের বিস্তার — নাগরিকরা সংবিধানিক প্রতিকার ব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস হারায়। স্বেচ্ছা ন্যায়বিচারের স্বাভাবিকীকরণ — মানুষ রাস্তার বিচার, গণপিটুনি বা সাম্প্রদায়িক প্রতিশোধে জড়িয়ে পড়ে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিচ্ছিন্নতা — সংখ্যালঘু, দলিত ও ভিন্ন মতাবলম্বীরা সংবিধানের প্রতিশ্রুতি থেকে নিজেদের বাদ পড়া মনে করে। জাতীয় ঐক্যের অবক্ষয় — ন্যায়বিচার যখন সাম্প্রদায়িক বা রাজনৈতিক বলে প্রতীয়মান হয়, তখন সামাজিক সংহতি ভেঙে পড়ে। ভয়, নীরবতা কিংবা চাপিয়ে দেওয়া ঐকমত্যের ওপর কোনো গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব:
বিচারব্যবস্থার এই অবক্ষয় দেশের নির্বাচনী গণতন্ত্রকে নানাভাবে প্রভাবিত করছে —
নির্বাচনী কৌশল হিসেবে মেরুকরণ: প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার ফলে নির্বাচন নীতিনির্ভর আলোচনার পরিবর্তে পরিচয়ভিত্তিক সংঘবদ্ধতার মঞ্চে পরিণত হয়। বেকারত্ব, বৈষম্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো বিষয়গুলির জায়গা দখল করে নেয় ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী বয়ান। সংখ্যাগরিষ্ঠতার বৈধতা: নির্বাচনী জয়কে নৈতিক বৈধতা হিসেবে ব্যবহার করে বিচার বিভাগ, গণমাধ্যম ও তদন্তকারী সংস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। “নির্বাচনে জয় মানেই নৈতিক অধিকার”–এই ধারণা সংবিধানিক ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে। ভোটারদের মোহভঙ্গ,
বিশেষ করে সংখ্যালঘু ও তরুণ সমাজের একাংশ মনে করে, ভোটদান বাস্তব পরিবর্তন আনে না। এর ফলে সচেতন গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের বদলে রাজনৈতিক উদাসীনতা বা বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণ বাড়ে। গণতান্ত্রিক জবাবদিহির দুর্বলতা: আদালত যদি সংবিধানিক অধিকারের রক্ষক হিসেবে ভূমিকা পালন না করে, তবে নির্বাচিত সরকারগুলির ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়ে, যা গণতন্ত্রের আবরণে কর্তৃত্ববাদী শাসনের ঝুঁকি বাড়ায়।
আস্থা পুনর্গঠনের পথ:
আস্থা পুনর্গঠনের জন্য কেবল কথার ফুলঝুরি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি, রাজনৈতিক ক্ষমতা নির্বিশেষে দ্রুত ও সমান ন্যায়বিচার, জনমতের ঊর্ধ্বে উঠে সংবিধানিক নৈতিকতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্রের অপরিহার্য উপাদান হিসেবে ভিন্নমতের সুরক্ষা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল — বিচার বিভাগকে কেবল কাঠামোগতভাবে নয়, নৈতিক সাহসের দিক থেকেও স্বাধীন হিসেবে প্রতীয়মান হতে হবে।
ভারত আজ এমন এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলি প্রক্রিয়াগতভাবে সচল থাকলেও নৈতিক ও সাংবিধানিক চাপে ভুগছে। বাবরি মসজিদ মামলার মতো রায়গুলি বিচারব্যবস্থার প্রতি জনআস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছে এবং নির্বাচনী রাজনীতিকে ন্যায়ের প্রশ্ন থেকে পরিচয়ের লড়াইয়ে রূপান্তরিত করেছে।
গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনের মাধ্যমে টিকে থাকে না; এটি টিকে থাকে আস্থার ওপর — এই বিশ্বাসের ওপর যে, সংবিধান সকল নাগরিককে সমানভাবে রক্ষা করবে। ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত না হলে নির্বাচন গণতন্ত্রের অর্থহীন আচারমাত্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। ভারতের গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তিতে নয়; বরং তার দুর্বলতম ও সংখ্যালঘু কণ্ঠকে সোচ্চার করার পরিসর তৈরিতে সহায়তা করার মধ্য নিহিত।



















































































































































