মেরুকরণ কি সব সমীকরণ পাল্টে দেবে?

মহম্মদ মফিজুল ইসলাম
ভারতীয় সভ্যতা বহু যুগ ধরে বহতা এসেছে নানা নদীর স্রোতের মতো — বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য, বহুত্বের শক্তি, মতের ভিন্নতার মাঝেও সহাবস্থানের ঐতিহ্য। এই বৈচিত্র্যই দেশটিকে এক অনন্য সুরে বেঁধেছে, যেখানে ধর্ম কেবল আচার নয়, মানুষের অন্তরের নৈতিক বোধ, মানবিকতার ভিত্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই ধর্মই রাজনৈতিক ব্যবহারের সবচেয়ে সহজ হাতিয়ার হয়ে উঠছে। ভোটের সমীকরণ বদলাতে, সামাজিক শক্তির মেরুদণ্ড নাড়িয়ে দিতে, ব্যক্তির পরিচয়কে সংকীর্ণ কোষে বন্দি করতে ধর্মীয় মেরুকরণের প্রবণতা আজ যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, তা চিন্তার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মহল্লার মোড়ে, সোশ্যাল মিডিয়ার স্ক্রলে, এমনকি সংসদের বিতর্কেও ধর্মের ব্যাখ্যা এখন মানুষের নয়, রাজনীতির ভাষায় লেখা হচ্ছে। অথচ মানুষের অভ্যন্তরীণ বিশ্বাস রাজনীতির পথে নয় — সত্য, সহনশীলতা, উদারতার পথে হাঁটে। সেই পথেই কোথাও যেন আলো কমে আসছে।
কেন এই মেরুকরণ? কারণ সহজ — ভয় এবং অবিশ্বাস রাজনীতির সবচেয়ে ফলদায়ক মুদ্রা। আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজে অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের অস্থিরতা, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা মানুষের মনকে করে তুলেছে ভঙ্গুর। এই ভঙ্গুরতার উপর দাঁড়িয়ে ধর্মের ভিত্তিতে পরিচয়কে তীক্ষ্ণ করা আরও সহজ। মানুষ যখন তার সব থেকে প্রাচীন পরিচয় ধর্ম, ভাষা, গোত্র — এসবের ভরসা খোঁজে, তখন রাজনীতি তাকে সেই পরিচয়কেই অস্ত্র বানাতে শেখায়। ফলে একদিকে যেমন মানুষ ক্রমে নিজের পরিচয়কে আঁকড়ে ধরতে থাকে, অন্যদিকে সেই পরিচয়কে অন্যের বিরুদ্ধে খাড়া করা হয়। এতে যে ক্ষত তৈরি হয়, তার রং লাল; কিন্তু শিকড় থাকে অদৃশ্য। মানুষের মনেই।

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতীয় সমাজে ধর্মীয় মেরুকরণ বৃদ্ধির সঙ্গে সামাজিক বিশ্বাসের হ্রাস গভীরভাবে যুক্ত। প্রতিবেশীকে সন্দেহ করা, ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষকে দূরে রাখা, নিজেদের সংস্কৃতি বিপন্ন ভাবা — এই আশঙ্কাগুলি বাস্তবের তুলনায় কল্পনার বেশি, তবে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কার্যকর। সামাজিক আচরণের ক্ষেত্রেও এ প্রভাব স্পষ্ট। বিয়েতে, পাড়ার উৎসবে, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নানা সম্প্রদায়ের মিলন ক্রমে কমছে। বহু পরিবারে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক মতভেদ এখন ধর্মীয় মনোভাবের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে সম্পর্ক ভাঙছে। অথচ ভারতীয় সমাজের মুখ্য শক্তি ছিল এমন বন্ধনই, যেখানে সাংস্কৃতিক ভিন্নতাই ছিল সৌন্দর্য।
শহরে যেমন জাতিগত ও ধর্মীয় বিভাজন বাড়ছে, তেমনই গ্রামে দেখা যাচ্ছে এক ভিন্ন সংকট –গুজব, ভুল তথ্য ও হঠাৎ উত্তেজনার বিষাক্ত বিস্তার। ডিজিটাল মাধ্যম এই মেরুকরণকে আরও গভীর করে তুলেছে। একদল অর্ধসত্যকে ‘সত্য’ বলে প্রচার করছে, আরেক দল সেই ‘সত্য’-এর বিরুদ্ধে লড়াই করছে। এর মাঝেই সাধারণ মানুষের মনে তৈরি হচ্ছে নীরব আতঙ্ক — আমরা কি সত্যিই নিরাপদ? এই প্রশ্নটাই রাজনীতির কাছে নিখুঁত মাটি। ফলে বাস্তবের সমস্যা — খরা, কৃষকের ঋণ, স্থানীয় অর্থনীতির ধস, শিক্ষার অবনতি — এ সবই ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায়। আলো পড়ে শুধুই ভাবাবেগে। মানুষ ভেবে নিতে থাকে, ধর্মই যেন নিজের অস্তিত্ব রক্ষার প্রধান ঢাল।
কিন্তু ইতিহাস কি সত্যিই এই পথকে সমর্থন করে? বরং ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে ধর্মীয় মেরুকরণের ফলে যে রাজনৈতিক লাভ ক্ষণস্থায়ী, তার মাশুল সামাজিকভাবে বহুকাল ধরে দিতে হয়। ১৯৪৭-এর দেশভাগের ক্ষতই তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতির ঢেউ, বৈশ্বিক নিন্দা — এসবই ইতিহাস জানে। পরে বিভিন্ন দাঙ্গা, ক্ষুদ্র সংঘর্ষ, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা — সবই সেই একই ছন্দের পুনরাবৃত্তি। মানুষ ভুলে যেতে পারে, কিন্তু ইতিহাস ভোলে না। আজও সেই ইতিহাস সতর্ক করে, মেরুকরণ শুরু হয় ভাঙা বিশ্বাসের ইট দিয়ে, আর শেষ হয় ভাঙা সমাজের প্রাচীর হয়ে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে এক গভীর পরিবর্তন লক্ষণীয় — রাজনীতি আর মানুষের ধর্মীয় আবেগকে আলাদা রাখছে না, বরং সেই আবেগকেই রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। ফলে ধর্ম আর ব্যক্তির অন্তর্গত অনুভব নয়; তা হয়ে উঠছে বহিরঙ্গ রাজনৈতিক প্রচারের ভাষা। এই পরিবর্তনের ফলে তরুণ প্রজন্মও প্রভাবিত হচ্ছে। শিক্ষার পরিসরে যুক্তিবাদ, বিজ্ঞান ও নাগরিক চেতনার চর্চা যত কমছে, ততই ধর্মীয় পরিচয় তাদের কাছে হয়ে উঠছে প্রধান আলোচ্য। প্রতিটি নির্বাচনে মেরুকরণের মাত্রা বাড়ছে — কেউ সংখ্যাগুরু পরিচয়কে সামনে আনছে, কেউ সংখ্যালঘু নিরাপত্তাহীনতার কথা বলছে। এরই মাঝে প্রশ্ন হারিয়ে যায়, নাগরিক অধিকার কি কেবল সংখ্যার ওপর দাঁড়াতে পারে? মানুষের মর্যাদা কি কেবল তার ধর্মের ওপর নির্ভরশীল?
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি সমস্যা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে — ধর্মীয় মেরুকরণের কারণে ‘মধ্যম পথ’ বা ‘যুক্তিবাদী অবস্থান’ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। সামাজিক আলোচনাগুলি হয়ে উঠছে তীব্রভাবে দুই মেরুর — এ বা ও। ফলে যে অংশটি নিরপেক্ষ, যুক্তিনিষ্ঠ, মানবিক পথ অনুসরণ করতে চায়, তার কণ্ঠস্বর প্রায় শোনা যায় না। অথচ গণতন্ত্রের মূল শক্তিই তো এই বিবেকী নাগরিক সমাজ। যাঁরা প্রশ্ন করেন, মতভিন্নতা মেনে নেন, অন্যের দৃষ্টিকোণকে সম্মান করেন — এই মানুষগুলিই সমাজকে সুস্থ রাখেন। কিন্তু মেরুকরণের রাজনীতিতে এরা ‘অপ্রয়োজনীয়’ হয়ে পড়েন। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ কি সম্ভব? অবশ্যই সম্ভব, যদি সমাজের তিনটি স্তর একত্রে কাজ করে: রাষ্ট্র, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষ।
রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, আইনশৃঙ্খলার দৃঢ়তা, সাম্প্রদায়িক উসকানির বিরুদ্ধে তড়িৎ ব্যবস্থা — এই তিনটি পদক্ষেপই মেরুকরণের আগুনকে ঠান্ডা করতে পারে। আইনসম্মত শাস্তির নিশ্চয়তা মানুষকে নিরাপদ করে তোলে। পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার জরুরি — যেখানে ইতিহাস সত্যনিষ্ঠভাবে শেখানো হবে, ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ সামনে আনা হবে, যুক্তিবাদী চিন্তা বাড়ানো হবে।
গণমাধ্যমের দায়িত্বও কম নয়। আজ সংবাদমাধ্যম সমাজের ভরসা; কিন্তু একই সঙ্গে উদ্বেগের কারণও। উত্তেজনাকে বাড়িয়ে তোলা, ক্লিক বাড়ানোর জন্য চাঞ্চল্য তৈরি করা, ভুয়ো তথ্য যাচাই না করে ছড়িয়ে দেওয়া — এগুলিই এখন মেরুকরণের অক্সিজেন। একটি দায়িত্বশীল গণমাধ্যমকে তথ্যের বিশুদ্ধতা, সংযত ভাষা এবং সংহতির বার্তা বহন করতে হবে। ভুয়ো বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়লে তা দ্রুত যাচাই করে সংশোধন করা এবং কুসংস্কার বা উত্তেজনা মোকাবিলায় যুক্তি, প্রমাণ ও বিজ্ঞানের আলোয় ব্যাখ্যা তুলে ধরা — এগুলোই হতে পারে প্রকৃত সাংবাদিকতার আসল শক্তি।
সবচেয়ে বড় শক্তি অবশ্য মানুষ নিজেই। ধর্মীয় শ্রদ্ধা মানুষের জীবনের মূল অংশ; কিন্তু সেই শ্রদ্ধাই যখন অন্যকে ঘৃণার চোখে দেখতে শেখায়, তখন ভেবে দেখা জরুরি; ধর্মের আসল শিক্ষা কি তা-ই? সমস্ত ধর্ম এক জিনিস শেখায় — মানবিকতা। তাই সামাজিক সম্পর্ক পুনর্গঠন, সম্প্রদায়ভিত্তিক মিলনমেলা, স্থানীয় সমস্যা সমাধানে যৌথ উদ্যোগ — এগুলো মানুষের মনে ভরসা ফিরিয়ে আনতে পারে। আলোচনা, বিতর্ক, মতের অমিল — এসব সামাজিক সুস্থতারই চিহ্ন। ঘৃণা নয়, সহনশীলতাই এগিয়ে যাওয়ার পথ।
অবশেষে একটি প্রশ্নই বারবার ফিরে আসে — ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি কি সত্যিই দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে? নাকি এর প্রতিরোধেই তৈরি হবে নতুন সামাজিক শক্তি? ভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, বহু ধর্ম ও ভাষার বহমান ঐতিহ্য, সাধারণ মানুষের সহিষ্ণুতা — এসবই বলে আমাদের সমাজ এখনও সম্পূর্ণভাবে মেরুকৃত নয়। মানুষের অভিজ্ঞতা, পরিবার, কর্মক্ষেত্র, উৎসব — এইসবের নিত্য অভ্যাসই বলে দেয়, মানুষ এখনো পাশে দাঁড়াতে জানে। রাজনীতি তাকে বিভক্ত করতে চায়; কিন্তু মানুষের অভ্যন্তরীণ মানবিক শক্তি তাকে আবারও একত্রিত করতে পারে। এই বিশ্বাসই ভবিষ্যতের পথ দেখাবে।
ধর্মীয় মেরুকরণ তাই কেবল একটি রাজনৈতিক কৌশল নয়, এটি একটি সামাজিক পরীক্ষাও। এই পরীক্ষায় রাষ্ট্র, সমাজ এবং নাগরিক সবাইকেই নিজেদের সেরা সংস্করণটি সামনে আনতে হবে। মানুষের মাঝে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা, পরস্পরের অভিজ্ঞতা বোঝা, ভয়কে ভাঙা, তথ্যকে সত্যের আলোয় প্রকাশ করা — এই পথেই আসবে পরিবর্তন। সমাজে ভারসাম্য তখনই ফিরে আসবে, যখন আমরা বুঝতে পারব ধর্মের ভিত্তি বিভাজন নয়; সংহতি। এবং গণতন্ত্রের শক্তি মানুষের সংখ্যায় নয়; মানবিকতায়।
এই উপলব্ধিই আমাদের বলবে — রাজনীতি যতই বিভাজনের রং মাখুক, মানুষের অন্তরের রং একটাই — সহাবস্থান। মেরুকরণের রাজনীতি হয়ত সমীকরণ সাময়িক পাল্টে দিতে পারে; কিন্তু মানুষের আকাঙ্ক্ষা শেষ পর্যন্ত শান্তি, ন্যায় এবং মর্যাদার দিকেই ফিরে যায়। সেখানেই ভবিষ্যতের আলো।































































































































